Home অন্যান্য জীবনের রিপোর্টার: এক ‘ভয়াবহ’ ভুল ও চার দশকের নীরবতা

জীবনের রিপোর্টার: এক ‘ভয়াবহ’ ভুল ও চার দশকের নীরবতা

কামরুল ইসলাম

স্মৃতির ধুলো ঝাড়লে মাঝেমধ্যে এমন কিছু ঘটনা বেরিয়ে আসে, যা আজও গায়ের লোম খাড়া করে দেয়। আজ থেকে ৪৪ বছর আগের কথা। ১৯৮২ সালের ৩ এপ্রিল। আমি তখন ‘দৈনিক সংবাদ’-এ স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিয়েছি মাত্র মাস কয়েক আগে—সময়টা ১৯৮১-র শেষ দিক। তরুণ রক্ত, চোখে সাংবাদিকতার নেশা আর মনে একরাশ ভয়-ভীতি।  থাকতাম আমার অকৃত্রিম বন্ধু, সাবেক অতিরিক্ত সচিব আ স ম মামুনুর রহমান খলিলীর সঙ্গে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক (এফএইচ) হলের ১১৪ নম্বর রুমে।
আবু জাফর শামসুদ্দিন
সেদিন ( ৩ এপ্রিল ১৯৮২) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সম্মেলন। আমার ওপর অ্যাসাইনমেন্টের দায়িত্ব পড়ল। সেই সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন আমাদের সংবাদেরই নিয়মিত কলামিস্ট, বরেণ্য সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দিন। যথাসময়ে অনুষ্ঠান কভার করে ২৬৩ বংশাল রোডের অফিসে ফিরলাম।
আবুল কালাম শামসুদ্দিন
কিন্তু মানুষের অবচেতন মন মাঝেমধ্যে এমন এক গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়, যার মাশুল হতে পারে ভয়াবহ। আমি পুরো প্রতিবেদনে প্রধান অতিথির নাম লিখলাম ‘আবুল কালাম শামসুদ্দিন’। এমনকি প্রয়াত আলোকচিত্রী অগ্রজ লুৎফুর রহমান বীনু যখন ছবিটা আমার সামনে রেখে গেলেন, আমি ছবির ক্যাপশনেও অবলীলায় লিখে দিলাম—আবুল কালাম শামসুদ্দিন। অথচ তিনি ১৯৭৮ সালের ৪ মার্চ প্রয়াত হয়েছেন, যা আমার সংবাদ-এ যোগদানেরও অনেক আগের ঘটনা।
ভুলের বিভীষিকা ও পলায়ন রাত গভীর করে যখন হলে ফিরলাম, হঠাৎ মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যাওয়ার মতো মনে পড়ল—সর্বনাশ হয়ে গেছে! আমি জ্যান্ত আবু জাফর শামসুদ্দিনকে মৃত আবুল কালাম শামসুদ্দিন বানিয়ে দিয়েছি। ততক্ষণে পত্রিকা ছাপা হয়ে গেছে, সংশোধনের কোনো পথ নেই। ওই রাতে আমার চোখের ঘুম উবে গিয়েছিল।
সেই সময়ের সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদক বজলুর রহমান ভাই ছিলেন অত্যন্ত কড়া মানুষ। আমার ঠিক আগেই নিয়োগ পাওয়া ৬ জন রিপোর্টারের ৩ জনের চাকরি চলে গিয়েছিল মাত্র তিন মাসের মাথায়। আমারও কি তবে আজ শেষ দিন?
ভোরে বিট পিয়ন পত্রিকা দিয়ে গেলে কাঁপাকাঁপা হাতে তা ধরলাম। প্রথম পাতার ভাঁজের নিচে দুই কলামে নিউজটি ছাপা হয়েছে। আশা ছিল হয়তো ডেস্কে বা প্রুফে কেউ ঠিক করে দেবে। কিন্তু না! অবিকল সেই ভুল নামটাই ছাপা হয়েছে। মহাকেলেঙ্কারির আশঙ্কায় আমি তখন দিশেহারা।
সংবাদ-এ তখন সকালের শিফট শুরু হতো ৯টায়। আমি দ্রুত বার্তা বিভাগে ফোন করে জানালাম, ‘জরুরি প্রয়োজনে চট্টগ্রামে আমার বাড়ি যেতে হচ্ছে, এটা যেন বার্তা সম্পাদকের জন্য নোট রাখা হয়।’ আসলে সেটা ছিল এক ধরনের পলায়ন। পরের দিনের পত্রিকায় তন্নতন্ন করে খুঁজলাম কোনো সংশোধনী আছে কি না। না, কোথাও নেই। তার পরের দিনও না।
তিন দিন পর যখন সব সাহস সঞ্চয় করে সন্ধ্যায় অফিসে হাজির হলাম, নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে নিয়েছিলাম—অব্যাহতি, সাসপেন্ড কিংবা শোকজ, যেকোনো কিছুর জন্য। অফিসের প্রবেশপথে টেলিফোন অপারেটর কাম রিসিপশনিস্টের ডেস্কে সব অফিশিয়াল চিঠি থাকত। সেখানে গিয়ে দেখলাম আমার নামে কোনো চিঠি নেই। বার্তা বিভাগে গিয়ে নিজের সিটে বসলাম। কারো আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।
রাত সাড়ে আটটার দিকে বজলুর রহমান ভাই অফিসে ঢুকলেন। ভাবলাম, এবার আর নিস্তার নেই। কিন্তু না, কিছুই হলো না! অবিশ্বাস্যভাবে ভুলটা কারো চোখেই পড়েনি। এমনকি খোদ আবু জাফর শামসুদ্দিন সাহেব, যিনি নিয়মিত ‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’ লিখতেন বা ‘অল্পদর্শী’ ছদ্মনামে জনপ্রিয় ছিলেন, তিনিও হয়তো সেটা খেয়াল করেননি।
যেখানে হার মানল সব ‘চেকপোস্ট’
একজন রিপোর্টারের প্রতিবেদন প্রথমে চিফ রিপোর্টারের হাতে যায়, সেখান থেকে ডেস্কে, তারপর কম্পোজ সেকশন হয়ে প্রুফ রিডারদের হাতে। সবশেষে একজন সাব-এডিটর গোটা পত্রিকা তন্নতন্ন করে দেখেন এবং প্রিন্ট অর্ডার দেন। অথচ এতগুলো চোখ ফাঁকি দিয়ে আবুল কালাম শামসুদ্দিনের নাম ছাপা হয়ে গেল।
চার দশকের বেশি দীর্ঘ এই পেশাগত জীবনে কত রিপোর্ট লিখেছি, কিন্তু ১৯৮২ সালের সেই ৩ এপ্রিলের ভুলের স্মৃতি আজও আমার কাছে সবচেয়ে বড় ‘লাইফ লেসন’। সাংবাদিকতায় শব্দের নির্ভুলতা যে কতটা জরুরি, আর ভাগ্য যে কখনো কখনো কতটা সহায় হয়, এই ঘটনা তার এক জীবন্ত দলিল। এত বছর এই ভুলের কথা কাউকে বলিনি, আজ প্রথমবার তা স্বীকার করে বুকটা হালকা হলো। সংবাদ-গ্রন্থাগারে ফাইল খুঁজে ৪ এপ্রিল ১৯৮২ তারিখের পত্রিকা দেখলে আমার সেই ভুল ধরা পড়বে।