Home জীবনের রিপোর্টার আমার প্রথম চাকরি ও ‘সংবাদ’-এর সোনালী দিন

আমার প্রথম চাকরি ও ‘সংবাদ’-এর সোনালী দিন

কামরুল ইসলাম

পেশাগত সাংবাদিকতার চার দশকের দীর্ঘ পথচলা। এই দীর্ঘ সময়ে ধুলো জমা স্মৃতির পাতায় কত ঘটনা, কত বিচিত্র কাহিনি যে ভিড় করে আছে, তার ইয়ত্তা নেই। মাঝেমধ্যে যখন জরাজীর্ণ পুরনো ডায়েরিটা খুলি, মনের আয়নায় ভেসে ওঠে রঙিন সব দিন। ‘দৈনিক সংবাদ’। আমার প্রথম কর্মস্থল, আমার প্রথম ভালোবাসা।

১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ‘সংবাদ’ আজ ৭৫ বছর সম্পন্ন করে ৭৬তম বছরে পদার্পণ করেছে। শুরুতে ভিন্ন মালিকানায় থাকলেও ১৯৫৪ সালের পর এর আদর্শগত পরিবর্তন আসে এবং এটি দেশের প্রগতিশীল চিন্তাধারার প্রধান ধারক হয়ে ওঠে। আহমদুল কবির, জহুর হোসেন চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার এবং বজলুর রহমানের মতো গুণী ব্যক্তিত্বরা যে পত্রিকার হাল ধরেছিলেন, সেই ঐতিহ্যের অংশ হতে পারাটা আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গৌরব।

সোনালী দিন ও অগ্রজদের স্নেহচ্ছায়া

সংবাদ-এ চাকরি করতাম সেই আশির দশকে। আমার প্রথম চাকরি। মানুষের প্রথম প্রেম আর প্রথম চাকরি কি অত সহজে ভোলা যায়? আমার ক্ষেত্রেও তাই। আজও মনে হয়— সংবাদ আমার, আর আমি সংবাদের।২৬৩ নম্বর বংশাল রোডের সেই বাড়িটি আজও আমার স্মৃতির মণিকোঠায় জীবন্ত। রিকশাওয়ালাকে যখন বলতাম, “নিশাত সিনেমার (মানসি) বিপরীতে সংবাদ অফিস যাব,” তখন বুকটা এক অজানা ভালোলাগায় ভরে উঠত। যদিও সংবাদ অফিস অনেক বছর হলো পুরানা পল্টনে স্থানান্তরিত হয়েছে, কিন্তু আমাদের আবেগটা রয়ে গেছে সেই বংশাল রোডেই।

আমি যখন সেখানে যোগ দিই, বয়সে এবং অভিজ্ঞতায় ছিলাম সবার চেয়ে কনিষ্ঠ। সময়টা ১৯৮১ সালের শেষ দিক। তরুণ রক্ত, চোখে সাংবাদিকতার নেশা আর মনে একরাশ ভয়-ভীতি। কিন্তু আমার সেই অগ্রজরা? তারা তাদের মর্যাদা যেমন রক্ষা করেছেন, তেমনি আমাকে আগলে রেখেছেন পরম মায়া ও স্নেহে। আজ এত বছর পরও অফিসের ঠিক কোন জায়গাটায় বসতাম, আমার পাশে কে ছিল— সব যেন দিবালোকের মতো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।

মনে পড়ে নাসিমুন্নাহার নিনি আপুর কথা। তখন তিনি সিনিয়র সাব-এডিটর, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী। নামটা বারবার ভুল করে ‘মিমি আপু’ বলে ফেলতাম। হোসনী দালান এলাকায় ওনার বাসায় কত বেলা যে খেয়েছি, তার হিসাব নেই। আর এক বড় আপু রওশন আরা জলি; একবার প্রচণ্ড ভাইরাস জ্বরে যখন আমি শয্যাশায়ী, তখন তিনি নিজের বাসায় নিয়ে গিয়ে মাতৃস্নেহে সেবা-যত্ন করে আমাকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। সেই ঋণ কি কোনোদিন শোধ করা সম্ভব?

খ্যাতিমান নারী নেত্রী নাসিমুন আরা হক মিনু আপুর কথাও খুব মনে পড়ে। ভীষণ ভালো একজন মানুষ, আজও মাঝেমধ্যে যোগাযোগ হয়। তবে আক্ষেপ রয়ে গেল মাসুমা খাতুন আপুকে নিয়ে। আমরা একসাথে কাজ করেছি, কিন্তু সংবাদ ছাড়ার পর আর কোনোদিন যোগাযোগ হয়নি। স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন কামদা প্রসাদ ভৌমিক। সে সময় তিনি আমাদের ইউনিট প্রধান ছিলেন। পরবর্তীতে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান এবং কয়েক বছর আগে লোকান্তরিত হয়েছেন। তাঁর স্নেহময় শাসন আজও মিস করি।

বংশাল রোডের সেই স্যাঁতসেঁতে গলি, কাগজের ঘ্রাণ আর আমাদের সেই আড্ডা— আহারে, কী সোনালী দিনই না ফেলে এসেছি!

আসলে ‘সংবাদ’ শুধু একটি পত্রিকা ছিল না, এটি ছিল প্রগতিশীলদের এক মহৎ মিলনমেলা। খেলাঘর আন্দোলন, সাহিত্য সাময়িকী আর মুক্তবুদ্ধির চর্চায় এই প্রতিষ্ঠানটি সবসময় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ কিংবা অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো গুণী মানুষেরা এই পত্রিকাকে সমৃদ্ধ করেছেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘গাছপাথর’ কিংবা সৈয়দ শামসুল হকের ‘হৃদকলমের টানে’র মতো তীক্ষ্ণ সাহসী কলামগুলোর জন্য পাঠকেরা যেমন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন, তেমনি আমরা ভেতরের মানুষগুলোও প্রতিদিন এক নতুন উদ্দীপনা পেতাম।

সময় বদলেছে, বদলেছে প্রযুক্তির ধরন, কিন্তু সংবাদের সেই ২৬৩ নম্বর বাড়ির আবেগটা আজও আগের মতোই সতেজ রয়ে গেছে। ৭৬ বছরে পদার্পণের এই মাহেন্দ্রক্ষণে ‘সংবাদ’-এর প্রতি রইল গভীর ভালোবাসা ও অন্তহীন কৃতজ্ঞতা।


ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com