Home অন্যান্য সতীত্ব ভঙ্গের অপরাধে কুমারী সেবিকাদের ‘জীবন্ত সমাধি’

সতীত্ব ভঙ্গের অপরাধে কুমারী সেবিকাদের ‘জীবন্ত সমাধি’

ফিচার

প্রাচীন রোমের অন্ধকার অধ্যায়: (প্রথম পর্ব)
স্মৃতি সরকার
রোমান সাম্রাজ্যের জাঁকজমক, বিশাল কলোসিয়াম, গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই আর পরাক্রমশালী সম্রাটদের কাহিনীর আড়ালে লুকিয়ে আছে কিছু অন্ধকার ও নির্মম ইতিহাস। যে রোমকে আমরা আইন, শৃঙ্খলা ও সভ্যতার সূতিকাগার বলে জানি, সেই রোমের বুকেই ধর্মের নামে, পবিত্রতা রক্ষার নামে যুগের পর যুগ ধরে চলেছে এক ভয়াবহ প্রথা। যেখানে সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত নারীদের সামান্য সন্দেহের জেরে দেওয়া হতো এক গা ছমছমে শাস্তি— ‘জীবন্ত সমাধি’। ইতিহাসের পাতায় এই অভিশপ্ত নারীরা পরিচিত ছিলেন ‘ভেস্টাল ভার্জিন’ বা সতী কুমারী সেবিকা নামে।
কারা এই ভেস্টাল ভার্জিন?
প্রাচীন রোমান পুরাণে অগ্নির দেবী ছিলেন ‘ভেস্টা’। রোমানদের বিশ্বাস ছিল, দেবী ভেস্টার মন্দিরে জ্বলতে থাকা পবিত্র আগুন যদি কখনো নিভে যায়, তবে পুরো রোম সাম্রাজ্যের ওপর নেমে আসবে চরম বিপর্যয়, যুদ্ধ কিংবা মহামারী। আর এই আগুনের পবিত্রতা রক্ষা এবং তা যেন কখনো নিভে না যায়, সেই দায়িত্ব দেওয়া হতো একদল কুমারী নারীর ওপর। এদেরই বলা হতো ভেস্টাল ভার্জিন।
রোমের অভিজাত পরিবারগুলো থেকে মাত্র ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী কন্যাসন্তানদের মধ্য থেকে কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে এই সেবিকাদের নির্বাচন করা হতো। একবার নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হতো এবং আগামী ৩০ বছরের জন্য তারা দেবী ভেস্টার চরণে উৎসর্গীকৃত হতেন।
সমাজের সর্বোচ্চ সম্মান ও কঠোর ব্রত
রোমান সমাজে নারীদের অধিকার যেখানে ছিল অত্যন্ত সীমিত, সেখানে ভেস্টাল ভার্জিনরা পেতেন সম্রাটের সমকক্ষ মর্যাদা।
রাস্তা দিয়ে তারা যখন হেঁটে যেতেন, স্বয়ং কনসাল বা সেনাপতিরাও তাদের পথ ছেড়ে দিতেন।
থিয়েটার বা গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াইয়ের মাঠে তাদের জন্য সংরক্ষিত থাকত সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসন।
কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী যদি ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় অলৌকিকভাবে কোনো ভেস্টাল ভার্জিনের দেখা পেয়ে যেত, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার ফাঁসি মওকুফ হয়ে যেত।
কিন্তু এই আকাশচুম্বী ক্ষমতার পেছনে ছিল এক কঠিন শর্ত— ‘পূর্ণ সতীত্ব’। ৩০ বছরের সেবিকা জীবনে তাদের চিরকুমারী থাকার কঠোর শপথ নিতে হতো। এই সতীত্বই ছিল তাদের ক্ষমতার উৎস, আবার এটিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ফাঁদ।
সতীত্ব ভঙ্গের সন্দেহ এবং ‘ইনসেস্টাস’ এর অভিযোগ
রোমান আইনে একজন ভেস্টাল ভার্জিনের সতীত্ব ভঙ্গ করাকে সাধারণ কোনো অপরাধ মনে করা হতো না। একে বলা হতো ‘ইনসেস্টাস’ (Incestus), যা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। কারণ রোমানদের বিশ্বাস ছিল, কোনো সেবিকা অপবিত্র হলে দেবী রুষ্ট হবেন এবং রোমের পতন ঘটবে।
দুর্ভাগ্যবশত, অনেক সময় রোম যখন কোনো যুদ্ধে হেরে যেত বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিত, তখন রোমান শাসকেরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এই কুমারী সেবিকাদের ওপর দোষ চাপাতেন। কোনো সেবিকার পোশাকের সামান্য ত্রুটি, পুরুষদের সাথে কথা বলার ধরন বা সাধারণ কোনো আচরণে সন্দেহ হলেই তার বিরুদ্ধে সতীত্ব ভঙ্গের অভিযোগ আনা হতো। আর এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে বা তীব্র সন্দেহ তৈরি হলে, তাদের জন্য অপেক্ষা করত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস মৃত্যুদণ্ড।
পবিত্র রক্তের অবমাননা না করার অজুহাতে এই সম্মানিত নারীদের তরবারি দিয়ে রক্তপাত ঘটিয়ে হত্যা করা হতো না। তবে তাদের জন্য রোমের শাসকেরা যে কুখ্যাত স্থানটি প্রস্তুত করে রেখেছিল, তা ছিল মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। কীভাবে কার্যকর করা হতো সেই জীবন্ত সমাধি? কী ঘটত রোমের সেই গোপন অন্ধকার কুঠুরিতে?
জানতে চোখ রাখুন এই সিরিজের আগামী পর্বে।
নিয়মিত এমন বৈচিত্র্যময় ঐতিহাসিক ও তথ্যসমৃদ্ধ ফিচার প্রতিবেদন পড়তে এবং আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে Visit www.businesstoday24.com