ঠকবাজির হাট
শামসুল ইসলাম, ঢাকা:
একটি ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার এখন আক্ষরিক অর্থেই পথে বসার উপক্রম হয়েছে। বিল্ডার্স কোম্পানিগুলোর চটকদার বিজ্ঞাপন আর কিস্তির প্রলোভনে পড়ে মানুষ জীবনের শেষ সম্বলটুকু তুলে দিচ্ছে তাদের হাতে। কিন্তু টাকা পরিশোধের পর শুরু হয় আসল ‘ঠকবাজি’। বছরের পর বছর পার হলেও ফ্ল্যাটের চাবি পাওয়া যায় না, বরং প্রতিবার নতুন অজুহাতে গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়।
জিম্মি করার নতুন কৌশল: পার্কিং ও ইউটিলিটি ফাঁদ
বিল্ডার্সরা সবচেয়ে বড় চালটি চালে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের আগমুহূর্তে। চুক্তির সময় অনেক খরচের কথা গোপন রাখা হয়। কাজ শেষ হওয়ার পথে এলে হঠাৎ জানানো হয়, পার্কিং স্পেস পেতে হলে আরও কয়েক লাখ টাকা গুনতে হবে, নয়তো ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়া যাবে না।
এছাড়া গ্যাস, বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগের নামে ‘ইউটিলিটি চার্জ’ হিসেবে অযৌক্তিক বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। গ্রাহক যখন ফ্ল্যাট পাওয়ার আশায় শেষ প্রান্তে থাকেন, তখন নিরুপায় হয়ে এই অন্যায় দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন। এটি শুধু ব্যবসায়িক নৈতিকতার লঙ্ঘন নয়, বরং পরিকল্পিত অপরাধ।
ভুক্তভোগীর আর্তনাদ: “নিজের টাকায় কেনা ফ্ল্যাট যেন এখন সোনার হরিণ”
রাজধানীর একটি নামী আবাসন প্রকল্পে ফ্ল্যাট কেনা ভুক্তভোগী মো. সানোয়ার হোসেনের (ছদ্মনাম) অভিজ্ঞতা শুনলে এই খাতের অন্ধকার দিকটি ফুটে ওঠে। তিনি বলেন: “২০১৯ সালে তিন বছরের মধ্যে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ৬০ লাখ টাকা নিয়েছে কোম্পানি। আজ ২০২৬ সাল, অথচ আজও তারা কাজ শেষ করেনি। গত মাসে যখন শেষবারের মতো গেলাম, তখন তারা উল্টো আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করছে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ার অজুহাতে। এমনকি যে পার্কিং স্পেসটি চুক্তিতে ছিল, এখন বলা হচ্ছে সেটার জন্য আলাদা টাকা দিতে হবে। ভাড়া বাসায় থেকে কিস্তি দিতে দিতে আমি এখন নিঃস্ব। প্রতিবাদ করলে তারা বলে—’পারলে মামলা করেন, ১০ বছরেও রায় পাবেন না’।”
সানোয়ার হোসেনের মতো হাজারো গ্রাহক আজ এই আইনি মারপ্যাঁচ আর বিল্ডার্সের স্বেচ্ছাচারিতার শিকার। রিহ্যাব (REHAB) ও সরকারি তদারকি সংস্থার কঠোর নজরদারি ছাড়া এই নৈরাজ্য বন্ধ করা অসম্ভব।
ফ্ল্যাট কেনা জীবনের অন্যতম বড় বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগকে সুরক্ষিত রাখতে এবং প্রতারক বিল্ডার্সদের হাত থেকে বাঁচতে ক্রেতাদের অত্যন্ত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আপনার সুরক্ষার জন্য নিচের পরামর্শগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করুন:
১. আইনি কাগজপত্র যাচাই (Legal Due Diligence)
টাকা দেওয়ার আগে জমি এবং প্রকল্পের বৈধতা যাচাই করুন। জমির মালিকানা বা মিউটেশন ঠিক আছে কিনা, প্রকল্পটি রাজউক (RAJUK) বা সিডিএ (CDA) অনুমোদিত কিনা এবং অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত হোন। প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীকে দিয়ে দলিলের শর্তগুলো পরীক্ষা করিয়ে নিন।
২. রিহ্যাব (REHAB) সদস্যপদ পরীক্ষা
বিল্ডার্স কোম্পানিটি রিহ্যাব-এর সদস্য কিনা তা যাচাই করুন। যদিও এটি শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় না, তবে কোনো সমস্যা হলে রিহ্যাব-এর সালিশি বোর্ডে অভিযোগ করার সুযোগ থাকে। সদস্য বিহীন কোম্পানির ক্ষেত্রে আইনি লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
৩. চুক্তিনামায় সুনির্দিষ্ট শর্ত যুক্ত করা
মৌখিক কথায় বিশ্বাস না করে সব বিষয় স্ট্যাম্পে লিখিত রাখুন। বিশেষ করে:
হস্তান্তরের তারিখ: ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট মাস ও বছর উল্লেখ থাকতে হবে।
ক্ষতিপূরণ ক্লজ: নির্ধারিত সময়ে হস্তান্তর করতে না পারলে বিল্ডার্স প্রতি মাসে কত টাকা ক্ষতিপূরণ (Delay Penalty) দেবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করান।
অতিরিক্ত চার্জ: ইউটিলিটি, পার্কিং বা কানেকশন ফি বাবদ কত টাকা দিতে হবে তা শুরুতেই ফিক্সড করে নিন, যাতে হস্তান্তরের সময় বাড়তি দাবি করতে না পারে।
৪. পেমেন্ট শিডিউল ও ব্যাংক লোন
এককালীন টাকা না দিয়ে কাজের অগ্রগতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কিস্তি নির্ধারণ করুন। সম্ভব হলে ব্যাংক লোনের মাধ্যমে ফ্ল্যাট কেনার চেষ্টা করুন। কারণ ব্যাংক লোন দেওয়ার আগে নিজের গরজেই প্রজেক্টের যাবতীয় কাগজপত্র যাচাই করে নেয়, যা আপনার জন্য একটি বাড়তি নিরাপত্তা স্তর হিসেবে কাজ করবে।
৫. নিয়মিত সাইট ভিজিট ও তদারকি
চুক্তি করার পর নিশ্চিন্তে বসে থাকবেন না। নিয়মিত নির্মাণাধীন প্রকল্প পরিদর্শন করুন। রড, সিমেন্ট ও অন্যান্য উপকরণের গুণগত মান এবং শ্রমিকের সংখ্যা দেখে আপনি বুঝতে পারবেন কাজ সময়মতো শেষ হবে কিনা। অস্বাভাবিক বিলম্ব দেখলে সাথে সাথে কোম্পানিকে লিখিত নোটিশ দিন।
৬. প্রতিকার পেতে আইনি পদক্ষেপ
যদি বিল্ডার্স চুক্তি ভঙ্গ করে বা অতিরিক্ত টাকা দাবি করে জিম্মি করে, তবে আপনি ‘রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০’ অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা দেওয়ানি আদালতে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। তবে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সব পেমেন্ট স্লিপ এবং চিঠিপত্রের কপি সংগ্রহে রাখুন।