আপনার রিপোর্ট কি আসলেও সঠিক?
সিরিজ প্রতিবেদন
পকেটে সিঁধ: ভোক্তার প্রতিদিনের লড়াই
কামরুল হাসান
অসুখ হলে সঠিক চিকিৎসার জন্য ডাক্তাররা বিভিন্ন টেস্ট দিয়ে থাকেন। আমরা বিশ্বাস করি, ল্যাবে দেওয়া রক্ত বা প্রস্রাবের রিপোর্টটি একদম নির্ভুল। কিন্তু আপনি কি জানেন, পাড়া-মহল্লায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আদতে কোনো দক্ষ টেকনিশিয়ান বা আধুনিক মেশিনই নেই? সস্তা কেমিক্যাল আর অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এসব রিপোর্ট আপনার চিকিৎসাকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। এর ফলে সুস্থ মানুষ ভুল ওষুধ খেয়ে অসুস্থ হচ্ছে, আর মুমূর্ষু রোগী সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বিজনেসটুডে২৪-এর অনুসন্ধানে ডায়াগনস্টিক খাতের কিছু ভয়াবহ অনিয়ম বেরিয়ে এসেছে।
ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেভাবে চলে ‘পরীক্ষা’ জালিয়াতি
১. টেস্ট না করেই ‘ভুয়া’ রিপোর্ট: সবচেয়ে ভয়ংকর জালিয়াতি হলো রক্ত বা নমুনা সংগ্রহ করার পর কোনো পরীক্ষা না করেই কম্পিউটারে আগের কোনো রোগীর রিপোর্টের টেম্পলেট ব্যবহার করে ফলাফল বসিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে টাইফয়েড, জন্ডিস বা ডেঙ্গুর মতো টেস্টগুলোতে এমন জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। আপনি টাকা দিচ্ছেন টেস্টের জন্য, কিন্তু পাচ্ছেন কেবল একটি কাগজ।
২. ডাক্তারের ‘কমিশন’ সিন্ডিকেট (Referral Fee): অধিকাংশ ছোট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের টিকে থাকার মূল মন্ত্র হলো ডাক্তারদের কমিশন। একটি টেস্টের মোট মূল্যের ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত কমিশন হিসেবে ডাক্তার বা দালালদের পকেটে যায়। এই কমিশনের টাকা তুলতে গিয়ে ল্যাবগুলো টেস্টের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং ডাক্তাররা প্রয়োজন না থাকলেও ডজন খানেক টেস্টের তালিকা ধরিয়ে দেন।
৩. মেয়াদোত্তীর্ণ কেমিক্যাল ও রি-এজেন্ট: রক্ত বা অন্যান্য পরীক্ষার জন্য দামী ‘রি-এজেন্ট’ বা কেমিক্যাল প্রয়োজন হয়। খরচ কমাতে অনেক ল্যাব মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের রি-এজেন্ট ব্যবহার করে। এতে রিপোর্টের মান (Accuracy) কমে যায় এবং ফলাফল ভুল আসে। বিশেষ করে হরমোন বা বায়ো-কেমিস্ট্রি টেস্টের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
৪. অনভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান ও প্যাথলজিস্ট: নিয়ম অনুযায়ী ল্যাব রিপোর্টে একজন বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্ট বা ডাক্তারের স্বাক্ষর থাকার কথা। কিন্তু অনেক ল্যাবে টেকনিশিয়ানরাই রিপোর্ট তৈরি করেন এবং ডাক্তারের সই জালিয়াতি করে বা ডিজিটাল স্বাক্ষর বসিয়ে দেওয়া হয়। ভুল স্যাম্পল কালেকশন বা ভুলভাবে স্যাম্পল সংরক্ষণের কারণেও রিপোর্ট ভুল আসার সম্ভাবনা থাকে।
ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টেস্ট করার সময় যা করবেন:
- অনুমোদন ও গ্রেড যাচাই: ল্যাবটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) থেকে অনুমোদিত কি না, তা নিশ্চিত হোন। বড় এবং নামী ল্যাবগুলো সাধারণত বিএসটিআই বা আন্তর্জাতিক মান (ISO) বজায় রাখে।
- রিপোর্টে ডাক্তারের স্বাক্ষর: রিপোর্ট নেওয়ার সময় দেখুন তাতে প্যাথলজিস্ট বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অরিজিনাল স্বাক্ষর আছে কি না। কেবল কম্পিউটারে টাইপ করা নাম দেখলে রিপোর্টটি সন্দেহজনক হতে পারে।
- ল্যাবের পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা: স্যাম্পল নেওয়ার সময় নতুন সিরিঞ্জ ব্যবহার করছে কি না এবং ল্যাবের পরিবেশ হাইজেনিক কি না, তা পর্যবেক্ষণ করুন। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে স্যাম্পল দিলে তাতে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
- ক্রস-চেকিং (Cross-Checking): যদি কোনো বড় ধরণের অপারেশনের সিদ্ধান্ত বা কঠিন রোগের রিপোর্ট পান এবং আপনার সন্দেহ হয়, তবে একই টেস্ট অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য বা বড় ল্যাব থেকে পুনরায় করিয়ে নিন।








