১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে তখন ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি। পোর্টল্যান্ড থেকে সিয়াটলগামী ‘নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইনস’-এর একটি ফ্লাইটে চড়ে বসলেন এক মধ্যবয়সী শান্ত চেহারার ব্যক্তি। পরনে কালো স্যুট, সাদা শার্ট আর চোখে কালো চশমা। টিকিট কাউন্টারে নিজের নাম লিখেছিলেন— ড্যান কুপার। কে জানত, কয়েক ঘণ্টা পর এই নামটাই হয়ে উঠবে আমেরিকার অপরাধ জগতের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত ব্ল্যাকহোল?
মাঝ আকাশে ব্রিফকেস ভর্তি বোমা
বিমান উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই কুপার একজন বিমানবালা বা ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টকে একটি চিরকুট দেন। সেখানে লেখা ছিল, তার ব্রিফকেসে একটি বোমা আছে। কুপার দাবি করেন দুই লক্ষ ডলার নগদ অর্থ এবং চারটি প্যারাশুট। বিমানটি সিয়াটল বিমানবন্দরে নামলে দাবি পূরণ করা হয় এবং কুপার যাত্রীদের মুক্তি দেন। কিন্তু বিমানটি পুনরায় উড়াল দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। গন্তব্য— মেক্সিকো সিটি।
সেই রহস্যময় লাফ
রাত তখন আটটা। বিমানটি যখন ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় ওয়াশিংটনের পাহাড়ি ও ঘন বনজঙ্গলের ওপর দিয়ে উড়ছে, তখন কুপার বিমানের পেছনের দরজা খুলে ফেলেন। দুই লক্ষ ডলার এবং প্যারাশুট নিয়ে ঝোড়ো বাতাসের বুক চিরে লাফ দেন তিনি। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত ড্যান কুপার বা ডি. বি. কুপারকে আর জীবন্ত বা মৃত অবস্থায় দেখা যায়নি।
কেন এটি একটি অমীমাংসিত ‘ব্ল্যাকহোল’?
১. পরিচয়হীন অপরাধী: ‘ড্যান কুপার’ ছিল একটি ভুয়া নাম। এফবিআই হাজার হাজার সন্দেহভাজনের তালিকা করলেও কাউকেই নিশ্চিতভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেনি। ২. টাকার উৎস: ১৯৮০ সালে এক কিশোর কলম্বিয়া নদীর পাড়ে বালুর নিচে কুপারকে দেওয়া সেই মুক্তিপণের কিছু আধপোড়া টাকা খুঁজে পায়। কিন্তু বাকি টাকার কোনো হদিস মেলেনি। ৩. বেঁচে থাকার সম্ভাবনা: প্যারাশুট নিয়ে সেই প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ঘন জঙ্গলে লাফ দিয়ে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। কিন্তু তার মৃতদেহ বা কোনো সরঞ্জাম আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘ ৪৫ বছর তদন্ত চালানোর পর ২০১৬ সালে এফবিআই আনুষ্ঠানিকভাবে এই মামলার ফাইল বন্ধ করে দেয়। আকাশপথের দস্যুতার ইতিহাসে ডি. বি. কুপার আজও এক জ্বলন্ত রহস্য, যার কূল-কিনারা করতে ব্যর্থ হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা বাহিনী।