ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদী। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার পথে হেভিওয়েট দীনেশ ত্রিবেদী
ডিএন রাকেশ, আাগরতলা: প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ সাজাতে এক বড় চমক দিতে চলেছে ভারত সরকার। পেশাদার কূটনীতিক বা আইএফএস (IFS) কর্মকর্তাদের প্রথাগত গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকার পরবর্তী ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী।
শেষ মুহূর্তে কোনো বড় রদবদল না ঘটলে, পশ্চিমবঙ্গের চলমান ভোটপর্ব মিটলেই তাঁর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বরত প্রণয় বর্মা ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীনেশ ত্রিবেদীর এই নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক কোনো রদবদল নয়, বরং এটি দিল্লির এক সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন শাসন এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক পালাবদলের জেরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে ভারত সরকার এবার একজন ‘হেভিওয়েট’ রাজনীতিবিদকে ময়দানে নামাতে চাইছে।
বিশেষ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনকালে দুই দেশের সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা ঘুচিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক সংলাপে বসা এবং তলানিতে ঠেকে যাওয়া আস্থাকে পুনরায় চাঙ্গা করাই হবে নতুন হাইকমিশনারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
দীনেশ ত্রিবেদীর ব্যক্তিগত প্রোফাইল ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দিল্লির এই সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি। গুজরাতি দম্পতি হীরালাল ত্রিবেদী ও উর্মিলাবেন ত্রিবেদীর কনিষ্ঠপুত্র দীনেশ ঝরঝরে বাংলায় কথা বলতে পারেন, যা দুই বাংলার সংস্কৃতি ও আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে তাঁকে বাড়তি সুবিধা দেবে। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে স্নাতক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রিধারী এই রাজনীতিক একাধারে অভিজ্ঞ প্রশাসক ও দক্ষ সেতারবাদক।
আশির দশকে কংগ্রেসে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করলেও, পরবর্তীতে জনতা দল এবং দীর্ঘ সময় তৃণমূল কংগ্রেসে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ব্যারাকপুরের সাংসদ থাকাকালীন তিনি মনমোহন সিংয়ের মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এবং রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে ২০১২ সালের রেল বাজেটে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে ভাড়া বৃদ্ধির সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি তৎকালীন সময়ে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে তিনি তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন।
সাউথ ব্লকের মতে, দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সম্পর্ক আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে ত্রিবেদীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিল্লির জন্য তুরুপের তাস হতে পারে।
একই সঙ্গে, এই নিয়োগের মাধ্যমে মোদী সরকার একটি অন্তর্নিহিত বার্তাও দিচ্ছে—তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিলে যোগ্যতার পুরস্কার যে নিশ্চিত, তা দীনেশ ত্রিবেদীর এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্ব পাওয়ার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দুই বাংলার সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক অবহিত একজন ব্যক্তিত্ব দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সুর বাঁধতে পারবেন কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।