Home অন্যান্য সাংবাদিকতায় নতুন বিপ্লব: প্রাতিষ্ঠানিক ব্র্যান্ড নয়, ব্যক্তিই সংবাদমাধ্যম

সাংবাদিকতায় নতুন বিপ্লব: প্রাতিষ্ঠানিক ব্র্যান্ড নয়, ব্যক্তিই সংবাদমাধ্যম

মোস্তফা তারেক, নিউইয়র্ক:
গণমাধ্যম জগতের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রথা ছিল—সংবাদকর্মী বা সাংবাদিকের চেয়ে সংবাদ প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিং বড়। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। আধুনিক সাংবাদিকতায় এখন ‘পার্সোনালিটি-লেড নিউজ’ (Personality-led News) বা ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সাংবাদিকতা নতুন মানদণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এখানে পাঠকরা কোনো বিশাল লোগো বা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে একজন নির্দিষ্ট সাংবাদিকের সত্যনিষ্ঠতা, বাচনভঙ্গি এবং বিশ্লেষণের ওপর বেশি আস্থা রাখছেন।
পরিবর্তনের মূল কারণসমূহ
১. আস্থার সংকট ও ব্যক্তিগত সংযোগ: রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজম-এর ২০২৬ সালের ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে ৬৮% পাঠক প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদের চেয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিচিত সাংবাদিক বা বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন। কর্পোরেট মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতার আশঙ্কায় পাঠকরা এখন সরাসরি সেই সব সাংবাদিকদের অনুসরণ করছেন যারা কোনো ভয় বা চাপের ঊর্ধ্বে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করেন।
২. সাবস্ট্যাক (Substack) ও নিউজলেটার বিপ্লব: সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতার দিন ফুরিয়ে আসছে। গবেষকদের মতে, ২০২৬ সালে ব্যক্তিগত নিউজলেটার প্ল্যাটফর্ম সাবস্ট্যাকের গ্রাহক সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ৪২% বৃদ্ধি পেয়েছে। সাংবাদিকরা এখন কোনো প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক না হয়ে সরাসরি পাঠকদের সাবস্ক্রিপশন বা চাঁদায় স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এটি সাংবাদিকদের জন্য যেমন স্বাধীনতার সুযোগ দিচ্ছে, পাঠকদের দিচ্ছে বিশেষায়িত বা ‘নিশ’ কন্টেন্ট।
৩. শর্ট-ফর্ম ভিডিও ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রভাব: নিউজ গার্ড (NewsGuard)-এর একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী দর্শকদের প্রায় ৬০% সংবাদ পাওয়ার জন্য বড় টিভি চ্যানেলগুলোর বদলে টিকটক, ইউটিউব বা এক্স (সাবেক টুইটার)-এ সক্রিয় জনপ্রিয় সংবাদ বিশ্লেষকদের ভিডিওর ওপর নির্ভর করেন। সংবাদের সাথে মানবিক আবেগ ও ব্যক্তিগত মতামতের সংমিশ্রণ এই জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ।
ঐতিহ্যবাহী সংবাদ সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
নিউজ মিডিয়া অ্যালায়েন্স-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড় বড় সংবাদ মাধ্যমগুলো এখন তাদের সেরা সাংবাদিকদের ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। যখন একজন জনপ্রিয় সাংবাদিক কোনো প্রতিষ্ঠান ছেড়ে নিজের ব্যক্তিগত চ্যানেল বা প্ল্যাটফর্ম শুরু করেন, তখন তার সাথে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রাহকও চলে যান। এতে সংবাদ সংস্থাগুলো বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব
বৈশিষ্ট্য প্রভাব
স্বচ্ছতা সাংবাদিকরা সরাসরি পাঠকদের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন বলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়।
গভীর বিশ্লেষণ কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর বিশেষজ্ঞ সাংবাদিকরা সাধারণ সংবাদের চেয়ে গভীর তথ্য প্রদান করতে পারেন।
মেরুকরণ ব্যক্তিত্ব-কেন্দ্রিক সাংবাদিকতায় অনেক সময় ব্যক্তিগত মতামত বা আবেগ তথ্যের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেতে পারে।
২০২৬ সালের এই ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতা এখন আর কেবল তথ্য সরবরাহের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি আস্থার সম্পর্কে পরিণত হয়েছে। সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকে থাকতে হলে এখন কেবল ব্র্যান্ডিং নয়, বরং তাদের সাংবাদিকদের ব্যক্তি-পরিচয় ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।