Home Second Lead কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভে মৃত্যুর ফাঁদ প্যারাসেইলিং

কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভে মৃত্যুর ফাঁদ প্যারাসেইলিং

প্যারাসেইলিং
তদারকিহীন বাণিজ্যে অকাতরে যাচ্ছে প্রাণ
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, কক্সবাজার: কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বিনোদনের নামে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ন্ত্রিত প্যারাসেইলিং ব্যবসা এখন পর্যটকদের জন্য মারাত্মক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা বিধিমালাকে  তোয়াক্কা না করে অপেশাদার ও অনভিজ্ঞ কর্মীদের দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এসব ঝুঁকিপূর্ণ রাইড।
সম্প্রতি খুলনা থেকে আসা পর্যটক শৌভিক রায়ের দরিয়ানগর পয়েন্টে প্যারাসেইলিং করার সময় আকাশ থেকে সাগরে ছিটকে পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন সেফটি সেল এবং তদারকি সংস্থাসমূহের ধারাবাহিক গাফিলতি ও অপেশাদারিত্বের সৃষ্ট এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা।
কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা, বাস্তবে বেপরোয়া বাণিজ্য
মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন দরিয়ানগর পয়েন্টে ‘প্যালাডিন প্যারাসেইলিং’ (বা সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং) নামের প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী উচ্চপ্রশিক্ষিত ইনস্ট্রাক্টর, নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা, সার্টিফাইড লাইফ জ্যাকেট, সুনির্দিষ্ট হার্নেস বেল্ট এবং সার্বক্ষণিক জরুরি উদ্ধারকারী বোট থাকা বাধ্যতামূলক হলেও এই প্রতিষ্ঠানে তা অনুপস্থিত ছিল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকির তথ্য প্রকাশের পর প্রশাসন সাময়িকভাবে রাইডটি বন্ধ ঘোষণা করেছিল। তবে অদৃশ্য শক্তির বলে এটি আবার চালু হয়। গত এপ্রিল মাসেও একই স্থানে এক পর্যটক গুরুতর আহত হন।
এই বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান সরাসরি অবৈধ পরিচালনার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিংটি অবৈধ। গত কয়েক মাসে একাধিকবার ম্যাজিস্ট্রেট এটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই তারা এটি পরিচালনা করে আসছিল। এ ব্যাপারে এখন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
অবৈধ ও বিপজ্জনক জেনে একাধিকবার বন্ধ করার পরও প্রভাবশালী এই চক্রটি কীভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর পর্যটকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছিল, তা নিয়ে এখন তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে।
ধারাবাহিক দুর্ঘটনা ও তদারকি সংস্থার ব্যর্থতা
পর্যটন সেফটি সেল এবং জেলা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির প্রত্যক্ষ নজরদারিতে এসব রাইড পরিচালনার কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো তদারকি ছিল না।
১. গত দুই বছরে কেবল দরিয়ানগর পয়েন্টেই অন্তত ১০ জন পর্যটক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
২. সি-সেফ লাইফ গার্ডের সুপারভাইজার সিফাত সাইফুল্লাহ জানান, কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত এলাকায় পর্যটকদের সুরক্ষায় কোনো লাইফগার্ড বা ডুবুরি থাকে না।
৩. বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও লাইসেন্স ও সেফটি অডিট ছাড়া অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ সরঞ্জাম।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে কোনো আন্তর্জাতিক মান, প্রশিক্ষিত অপারেটর বা উদ্ধারকারী জলযান ছাড়াই অবৈধ প্যারাসেইলিং ব্যবসা চলছে। নিরাপত্তা মান যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এসব ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার দাবি জানান তিনি।
তাৎক্ষণিক উদ্ধারের অভাব ও করুণ পরিণতি
শনিবার দুপুরে শৌভিক রায় যখন আকাশ থেকে সাগরে আছড়ে পড়েন, তখন তাকে উদ্ধারের জন্য ঘটনাস্থলে কোনো জরুরি উদ্ধারকারী ব্যবস্থা ছিল না। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুবক্তগীন মোহাম্মদ সোহেল তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে পৌঁছানোর পূর্বেই তার মৃত্যু হয়েছিল বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
ঘটনার পর প্রতিবারের মতো এবারও কেবল আইনি ব্যবস্থার আশ্বাসে দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে। সচেতন মহলের মতে, অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে ‘প্যালাডিন প্যারাসেইলিং’-এর মালিক ও পরিচালকদের পাশাপাশি যেসব প্রশাসনিক কর্মকর্তার অবহেলায় এই অবৈধ রাইড সচল ছিল, তাদের প্রত্যেককে কঠোর আইনের আওতায় আনা আবশ্যক।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com। আমাদের সংবাদ ও বিশ্লেষণের সঙ্গে থাকতে প্ল্যাটফর্মটি ফলো করুন এবং নিচে আপনার মতামত জানিয়ে মন্তব্য করুন।