Home সারাদেশ কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ১৫ বছর: ফেলানী কি শুধুই একটি নাম, নাকি বিচারহীনতার...

কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ১৫ বছর: ফেলানী কি শুধুই একটি নাম, নাকি বিচারহীনতার প্রতীক?

নয়ন দাস, কুড়িগ্রাম: আকাশে তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। কনকনে শীতের সকালে বাবার হাত ধরে কাঁটাতারের মই বেয়ে নিজের শিকড়ে ফেরার স্বপ্ন দেখছিল ১৫ বছরের এক কিশোরী। কিন্তু একটি বুলেট সেই স্বপ্নকে বিদীর্ণ করে দিল।
নিথর দেহটা ঝুলে রইল কাঁটাতারের ওপর— দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা। সেই দৃশ্য দেখে কেঁপে উঠেছিল বিশ্ববিবেক, ভিজেছিল দুই বাংলার মানুষের চোখ।
আজ ৭ জানুয়ারি। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তের সেই বিভীষিকাময় ফেলানী হত্যার ১৫ বছর পূর্ণ হলো। দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও ফেলানীর মা-বাবার আর্তনাদ থামেনি, মেলেনি কাঙ্ক্ষিত বিচার।
স্মৃতির ক্ষত ও বিচারহীনতার আক্ষেপ
মঙ্গলবার নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রামখানা কলোনিটারী গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক বিষণ্ণ পরিবেশ। মেয়ের কবরের চারপাশ পরিষ্কার করছেন বাবা নূরুল ইসলাম ও মা জাহানারা বেগম। ১৫টি বছর পার হয়ে গেলেও তাদের দুচোখের জল শুকায়নি।
নূরুল ইসলাম বলেন, “গভীর রাতে এখনো মেয়ের চিৎকার শুনতে পাই। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য— আমার কলিজার টুকরাটা পাখির মতো কাঁটাতারে ঝুলে আছে।” আক্ষেপের সুরে মা জাহানারা বলেন, “বিচার চেয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরলাম, কিন্তু কেউ আমাদের কথা শুনল না।”
সড়কের নাম ‘ফেলানী’, কিন্তু অধিকার কতদূর?
ফেলানী হত্যার স্মরণে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। গত ৯ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গুলশান-২ থেকে প্রগতি সরণি পর্যন্ত সড়কটির নাম ‘ফেলানী সড়ক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর আগে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর সাধারণ নাগরিকরাও প্রতীকীভাবে সড়কের নামফলক বসিয়েছিল।
তবে নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামসুদ্দীন মনে করেন, কেবল সড়কের নাম পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। তারা দীর্ঘ দিন ধরে ৭ জানুয়ারিকে ‘ফেলানী দিবস’ ঘোষণা এবং বিশ্বব্যাপী সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন। ২০১৫ সালে জাতিসংঘে এ নিয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হলেও কোনো সদস্য রাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেনি।
আইনি লড়াইয়ের গোলকধাঁধায় বন্দি বিচার
ফেলানী হত্যার বিচার প্রক্রিয়া যেন এক অন্তহীন গোলকধাঁধা। ইতিহাসের পাতা উল্টলে দেখা যায়:
২০১৩: অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করে ভারতের বিশেষ আদালত।
২০১৪: পুনর্বিচার শুরু হলেও বারবার তা স্থগিত হয়ে যায়।
২০১৫: ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণের অনুরোধ জানালে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্টো ফেলানীর বাবাকেই দোষারোপ করে।
২০২০: সুপ্রিম কোর্টে সর্বশেষ শুনানির তারিখ থাকলেও তা আর এগোয়নি।
মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মামলাটি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। আমরা চেষ্টা করছি, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।”
ফেলানী আজ কেবল একটি নাম নয়, বরং বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সংকটের এক জীবন্ত ক্ষত। ১৫ বছর আগে কাঁটাতারে ঝুলে থাকা সেই কিশোরীর লাল জামাটি আজও যেন মনে করিয়ে দেয়— সার্বভৌমত্ব আর মানবতার চেয়ে বড় কোনো বিচার হতে পারে না।
ফেলানীর পরিবার এখনো পথ চেয়ে আছে। সেই সড়কের নাম ‘ফেলানী সড়ক’ হোক কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিবাদ উঠুক, তাদের শেষ আকাঙ্ক্ষা একটাই— ঘাতক অমিয় ঘোষের শাস্তি এবং সীমান্ত হত্যার চিরস্থায়ী অবসান।