বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছে এই খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। রোববার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এই সংকটের চিত্র তুলে ধরেন।
রপ্তানিতে ধস ও ক্রমবর্ধমান ব্যয়
বিজিএমইএ সভাপতির দেওয়া তথ্যমতে, বৈশ্বিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি নিম্নমুখী। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ৩.৭৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে রপ্তানির এই নেতিবাচক ধারা কারখানাগুলোকে সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদনে বাধ্য করছে। ফলে ফিক্সড কস্ট বা স্থায়ী ব্যয় আনুপাতিক হারে বেড়ে গিয়ে কারখানাগুলোকে আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
উৎপাদন খরচের লাগামহীন বৃদ্ধি
প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে উৎপাদন সংশ্লিষ্ট প্রতিটি খাতের খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে:
১. জ্বালানি ব্যয়: ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গ্যাসের দাম বেড়েছে ২৮৬ শতাংশ এবং গত ৫ বছরে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ৩৩ শতাংশ।
২. শ্রমিক মজুরি: ২০২৪ সালে ন্যূনতম মজুরি ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করা হয়েছে।
৩. পরিবহন ও ঋণ: চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ ২০২৫ সালের অক্টোবরে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে ঋণের সুদের হার বর্তমানে ১২% থেকে ১৫%-এ পৌঁছেছে, যা বিনিয়োগের পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
৪. প্রণোদনা হ্রাস: ২০২৩ সালের জুলাই থেকে রপ্তানি প্রণোদনা ধাপে ধাপে গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনা হয়েছে।
সরকারের কাছে বিজিএমইএ’র বাজেট প্রস্তাবনা
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিএমইএ আগামী জাতীয় বাজেটে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু নীতি সহায়তার দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—রপ্তানির বিপরীতে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৬৫ শতাংশ করা এবং এটি আগামী ৫ বছরের জন্য স্থায়ী করা। এছাড়া নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ হারে আয়কর কর্তন অব্যাহতি এবং সোলার পিভি সিস্টেম ও ইটিপি’র কাঁচামালে শুল্ক সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ অর্জনকারী এই শিল্পকে রক্ষা করতে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় আরও বেশিসংখ্যক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।