Home ক্যারিয়ার ভোটের হাওয়া: ‘আশ্বাস নয়, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চাই

ভোটের হাওয়া: ‘আশ্বাস নয়, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চাই

মাঠপর্যায়ে তারুণ্যের দাবি

ফরিদুল আলম, ঢাকা: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের চায়ের আড্ডা—সবখানেই এখন আলোচনার তুঙ্গে ভোটের সমীকরণ। তবে এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর তাত্ত্বিক বিতর্কের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট: বেকারত্ব। দেশের কয়েক কোটি তরুণ ভোটারের কাছে এবারের প্রধান ইস্যু—কর্মসংস্থান।
সরেজমিনে নীলক্ষেত ও শাহবাগ: ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই
বুধবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে কথা হয় মো. আরিফুল ইসলামের সঙ্গে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে তিন বছর ধরে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। আরিফুল বলেন, “আমরা রাজনৈতিক আদর্শের লড়াই দেখতে চাই না। আমরা চাই এমন সরকার, যারা মেধার ভিত্তিতে চাকরির নিশ্চয়তা দেবে। প্রতি বছর লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, কিন্তু কর্মক্ষেত্র বাড়ছে না। এবারের নির্বাচনে আমার ভোট তাকেই দেব, যার ইশতেহারে বেকারত্ব দূরীকরণের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ থাকবে।”
একই চিত্র দেখা গেল নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানগুলোতে। সেখানে চাকরির গাইড কেনায় ব্যস্ত তরুণদের চোখেমুখে এক ধরনের অনিশ্চয়তা আর চাপা ক্ষোভ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, “জুলাই বিপ্লবের পর আমরা একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেই বৈষম্যহীনতার প্রথম শর্ত হওয়া উচিত স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং বেসরকারি খাতেও কাজের সুযোগ তৈরি করা।”
প্রধান ইস্যু যখন বেকারত্ব: পরিসংখ্যানে তারুণ্য
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ ও পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের মোট ভোটারের একটি বিশাল অংশ তরুণ। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক সচেতনতা বহুগুণ বেড়েছে। তারা এখন কেবল ‘ভোটার’ নয়, বরং ‘পরিবর্তনের কারিগর’।
শিক্ষিত বেকারের হার: ২০২৪-২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ভোটের প্রভাব: বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ২ কোটি তরুণ ভোটার এবার নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে নির্ধারক ভূমিকা পালন করবেন।
বিদেশের নেশা: কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে প্রায় ৫৫% তরুণ সুযোগ পেলে দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন, যা দেশের মেধা পাচারের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো তাদের ইশতেহারে তরুণদের টানতে নানা লোভনীয় অফার দিচ্ছে। কেউ বলছে বছরে ১০ লাখ কর্মসংস্থান, কেউবা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে ‘বেকার ভাতা’র। তবে ভোটাররা এবার আর মৌখিক আশ্বাসে ভুলতে রাজি নন।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও তরুণ বিশ্লেষক নাজমুল হাসান বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো বেকারত্ব নিয়ে বড় বড় কথা বললেও শিল্পায়নের বাস্তব পরিকল্পনা নিয়ে তেমন কিছু বলছে না। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসার ছাড়া এই সমস্যা মিটবে না।”
মাঠপর্যায়ের উত্তাপ: ভোটাভুটিতে প্রভাব

শহরের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামাঞ্চলেও এখন নির্বাচনী উত্তাপ তুঙ্গে। তবে এবারের প্রচারণায় তরুণদের মধ্যে এক নতুন ধরনের সচেতনতা লক্ষ্য করা গেছে। তারা কেবল দলীয় স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রার্থীদের সরাসরি প্রশ্নবাণে জর্জরিত করছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং সাবেক ক্ষমতাসীনদের অনুপস্থিতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেখানে তরুণরা এখন নতুন নেতৃত্বের কাছে ‘জবাবদিহিতা’ দাবি করছেন।

বগুড়ার একটি নির্বাচনী এলাকায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণ ভোটার বলেন, “আগে ভোট মানেই ছিল লাঠিয়াল হওয়া বা মিছিলের পেছনে থাকা। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। সাবেকরা তো পালিয়েছে বা আত্মগোপনে, কিন্তু যারা এখন ভোটের মাঠে নতুন বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছেন, তাদের কাছে আমাদের সোজাসাপ্টা প্রশ্ন—আমাদের কর্মসংস্থানের জন্য আপনাদের বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ কী? কেবল ইশতেহারে নয়, আগামী ৫ বছরে এই এলাকায় নতুন শিল্পায়ন বা কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট কী সুযোগ তৈরি হবে, তা জেনেই আমরা এবার ব্যালট পেপারে সিল মারব।”

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কেবল সরকার গঠনের লড়াই নয়; বরং এটি বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকার তরুণদের ভাগ্য নির্ধারণের পরীক্ষা। তরুণরা চায় এমন এক নেতৃত্ব, যারা গালভরা বুলির পরিবর্তে স্বচ্ছতা, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে এই ‘বেকারত্ব ক্ষোভ’ কতটুকু প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।