গৌহাটি উচ্চ আদালত এক ঐতিহাসিক নির্দেশে আসামের ঐতিহ্যবাহী মহিষের লড়াই বা ‘মোহ জুজ’ অবিলম্বে বন্ধ করার আদেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে এই আদেশ অমান্যকারী আয়োজকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পশু অধিকার সংস্থা পিইটিএ ইন্ডিয়া (PETA India)-র আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, ১৯৬০ সালের পশু নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী এ ধরনের রক্তাক্ত প্রদর্শনী সম্পূর্ণ অবৈধ।
যেভাবে চলে নিষ্ঠুরতার মহোৎসব
মহিষের লড়াই কেবল একটি সাধারণ প্রতিযোগিতা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকে প্রাণীদের ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতনের এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। পিইটিএ-র সংগৃহীত প্রমাণ এবং মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে এই নিষ্ঠুরতার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে:
শারীরিক আঘাত ও উত্তেজনা সৃষ্টি: লড়াই শুরু করার আগে মহিষগুলোকে উত্তেজিত করার জন্য এবং লড়াইয়ে বাধ্য করার জন্য সেগুলোকে নির্দয়ভাবে মারধর করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে মহিষের সংবেদনশীল অঙ্গে সুচ ফোটানো বা লাঠি দিয়ে আঘাত করার মতো ঘটনা ঘটে, যাতে যন্ত্রণায় প্রাণীটি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
লড়াই চলাকালীন রক্তক্ষরণ: প্রতিযোগিতার সময় দুটি মহিষ একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের শিংয়ের আঘাতে শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। ছবি ও ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, লড়াইয়ের ময়দানে মহিষগুলো রক্তাক্ত অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে। অনেক সময় হাড় ভেঙে যাওয়া বা গভীর ক্ষত তৈরি হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোকে থামানো হয় না।
মানসিক আতঙ্ক: প্রাকৃতিকভাবে মহিষ শান্ত প্রকৃতির প্রাণী হলেও জনসমক্ষে হাজার হাজার মানুষের চিৎকারের মধ্যে সেগুলোকে লড়াই করতে বাধ্য করা হয়। এই পরিবেশ প্রাণীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে, যা প্রাণী অধিকারের চরম লঙ্ঘন।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছে যে, বিনোদনের নামে পশুপাখির ওপর এমন নৃশংসতা কোনো আধুনিক সমাজে কাম্য নয়। ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের ‘অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার বোর্ড অব ইন্ডিয়া বনাম এ. নাগরাজা’ মামলার রায়ের প্রসঙ্গ টেনে আদালত জানায়, পশুর প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী। এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও আদালত মহিষ ও বুলবুল পাখির লড়াইয়ের ওপর জারি করা রাজ্য সরকারের অনুমতিপত্র বাতিল করেছিল।
পিইটিএ ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মহিষদের রক্তাক্ত করে জনসমক্ষে বিনোদন নেওয়া কোনোভাবেই আসামের সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। এই রায়ের ফলে আসামের গ্রাম্য মেলায় প্রাণীদের ওপর যে ধারাবাহিক নির্যাতন চলছিল, তা বন্ধ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।