Home সারাদেশ সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ম্যাজিক’ ওষুধের ছড়াছড়ি: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে জনজীবন

সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ম্যাজিক’ ওষুধের ছড়াছড়ি: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে জনজীবন

ছবি এ আই
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: ফেসবুক বা ইউটিউব স্ক্রল করলেই এখন চোখে পড়ে হরেক রকম ওষুধের চটকদার বিজ্ঞাপন। “এক ফাইলই যথেষ্ট”, “বিফলে মূল্য ফেরত”, কিংবা “গ্যারান্টিসহ চিরস্থায়ী সমাধান”—এমন সব মুখরোচক স্লোগানে সয়লাব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে যৌনরোগ, ওজন কমানো, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং চর্মরোগের তথাকথিত ‘ম্যাজিক’ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে দেদারসে।
চিকিৎসকদের মতে, এসব চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি অপেক্ষা করছে।
বিজ্ঞাপনের ফাঁদে সাধারণ মানুষ

অসাধু চক্রগুলো বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং মধ্যবয়সীদের টার্গেট করে এসব বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ওষুধের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদন থাকে না। সহজলভ্যতা এবং গোপনীয়তা রক্ষার সুযোগে মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই এসব সেবন করছে, যা পরবর্তীতে ভয়াবহ জটিলতার সৃষ্টি করছে।

প্রফেসর এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম

বিশেষজ্ঞের মতামত: ড. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম কী বলছেন?

এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) প্রাক্তন নেতা এবং চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম।

দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন:

“সোশ্যাল মিডিয়ায় যেসব যৌনবর্ধক বা চর্মরোগের ওষুধের বিজ্ঞাপন দেখা যায়, তার সিংহভাগই ভুয়া এবং বিপজ্জনক। অনেক ক্ষেত্রে এসব ওষুধে উচ্চমাত্রার স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো থাকে, যা সাময়িকভাবে কাজ করছে বলে মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরের অপূরণীয় ক্ষতি করে।”

ডা. সিরাজুল ইসলাম আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা তুলে ধরেন:

কিডনি ও লিভারের ক্ষতি: অনুমোদনহীন এসব ওষুধ সেবনে মানুষের কিডনি বিকল হওয়া এবং লিভারের কার্যক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

ভুল চিকিৎসা ও মানসিক চাপ: যৌন স্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে অপচিকিৎসা গ্রহণ করায় রোগীরা শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি চরম মানসিক অবসাদে ভোগেন। অনেক সময় স্বাভাবিক সক্ষমতাও চিরতরে হারিয়ে যায়।

চর্মরোগের ঝুঁকি: চর্মরোগের জন্য যেসব ক্রিম বা মলম অনলাইনে বিক্রি হয়, সেগুলোতে থাকা অতিরিক্ত স্টেরয়েড চামড়াকে পাতলা করে ফেলে এবং স্কিন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

প্রতারণা: ‘বিফলে মূল্য ফেরত’—এটি স্রেফ একটি ব্যবসায়িক কৌশল। যখন কোনো রোগীর ক্ষতি হয়, তখন ওই সব পেজ বা বিক্রেতাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

জনস্বার্থে সতর্কতা ও করণীয়

প্রফেসর ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “অসুখ হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে সমাধান খুঁজলে চলবে না। মনে রাখবেন, কোনো ওষুধই সবার জন্য সমান নয় এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের শামিল।”

সতর্কতামূলক টিপস:

বিজ্ঞাপনের কোনো ওষুধ কেনার আগে সেটি ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) অনুমোদিত কি না যাচাই করুন।

রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো হরমোনাল বা যৌনবর্ধক ওষুধ সেবন করবেন না।

চটকদার স্লোগান দেখে প্রলুব্ধ না হয়ে রোগের সঠিক কারণ নির্ণয় করুন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওষুধের এই অনিয়ন্ত্রিত বিজ্ঞাপনের লাগাম টেনে ধরতে সরকারের নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা—উভয়ই জরুরি। অন্যথায়, ঘরে ঘরে অকাল অসুস্থতা এবং অঙ্গহানির মতো ঘটনা বেড়েই চলবে।