সিরিজ প্রতিবেদন
পকেটে সিঁধ: ভোক্তার প্রতিদিনের লড়াই
কামরুল হাসান
বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন, কিন্তু এই বন্ধন গড়ার নাম করে এখন চলছে কোটি টাকার বাণিজ্য। বড় বড় পত্রিকায় ‘পাত্রী চাই’ বা ‘পাত্র চাই’ বিজ্ঞাপনের আড়ালে ওত পেতে আছে ভয়ংকর প্রতারক চক্র। আমেরিকা, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সুন্দরী পাত্রীর প্রলোভন দেখিয়ে বেকার যুবকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া কিংবা ভুয়া পাত্র সাজিয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েদের জীবন নষ্ট করে দেওয়া এখন ম্যারেজ মিডিয়াগুলোর প্রধান ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এই ‘বিবাহ-ফাঁদে’ পড়ে কেবল টাকা নয়, অনেক পরিবার সামাজিক সম্মানও হারাচ্ছে।
বিজনেসটুডে২৪-এর অনুসন্ধানে ম্যারেজ মিডিয়া ও আধুনিক ঘটকদের কিছু ভয়ংকর জালিয়াতি বেরিয়ে এসেছে।
১. প্রবাসী পাত্রীর বিজ্ঞাপন ও ‘ভিসা’ জালিয়াতি: পত্রিকায় আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়— “আমেরিকা প্রবাসী পাত্রীর জন্য পাত্র চাই, বিয়ের পর পাত্রীকে বিদেশে নেওয়া হবে।” যোগাযোগ করলে ম্যারেজ মিডিয়া থেকে একজন কথিত পাত্রীর সাথে দেখা করানো হয়।
এরপর পাসপোর্ট-ভিসা প্রসেসিং বা এয়ার টিকিটের নাম করে ধাপে ধাপে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে অফিস গুটিয়ে পালিয়ে যায় চক্রটি। অনেক সময় চক্রের নারী সদস্যদেরই ‘ভুয়া পাত্রী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
২. সদস্য ফি ও ‘পাত্রী দেখা’ বাণিজ্য: অনেক নামী-দামী ম্যারেজ মিডিয়া শুরুতে ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘রেজিস্ট্রেশন ফি’ নেয়। এরপর তারা দিনের পর দিন ভুয়া বায়োডাটা পাঠাতে থাকে। কোনো পাত্রী বা পাত্রপক্ষই আসলেও বিয়ের জন্য আগ্রহী থাকে না। বরং মিডিয়ারই কিছু বেতনভুক্ত লোক ‘পাত্রী’ সেজে রেস্টুরেন্টে দেখা করতে আসে যাতে ক্লায়েন্টের বিশ্বাস বাড়ে এবং আরও টাকা দাবি করা যায়।
৩. তথ্য গোপন ও কাবিননামা জালিয়াতি: ঘটক বা মিডিয়াগুলো পাত্র বা পাত্রীর আগের বিয়ে, চারিত্রিক সমস্যা বা শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য দেয়। বিয়ের পর যখন সত্য বেরিয়ে আসে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়।
অনেক সময় কাবিননামায় বিশেষ শর্ত (যেমন- বিয়ের পর আলাদা থাকা বা বড় অংকের দেনমোহর) সুকৌশলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যা পরে মামলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চক্রটি।
৪. ব্ল্যাকমেইলিং ও ভিডিও জালিয়াতি: কিছু অসাধু ম্যারেজ মিডিয়া পাত্র-পাত্রীকে একাকী দেখা করার সুযোগ করে দেয় এবং গোপনে সেই মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে। পরবর্তীতে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা দাবি করা হয়।
ম্যারেজ মিডিয়া বা ঘটক ধরলে প্রতারণা এড়াতে যা করবেন:
- ব্যক্তিগতভাবে তথ্য যাচাই (Personal Verification): ঘটক বা মিডিয়া যাই বলুক না কেন, পাত্র বা পাত্রীর কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রতিবেশীদের কাছ থেকে গোপনে তথ্য যাচাই করুন। মিডিয়ার দেওয়া তথ্যের ওপর অন্ধবিশ্বাস করবেন না।
- অফিসের বৈধতা যাচাই: ম্যারেজ মিডিয়ার ট্রেড লাইসেন্স ও স্থায়ী অফিস আছে কি না দেখুন। কেবল একটি মোবাইল নম্বর বা ফেসবুক পেজ দেখে লেনদেন করবেন না।
- বড় অংকের লেনদেন এড়িয়ে চলুন: বিয়ের আগে ভিসা বা বিদেশের কথা বলে টাকা চাইলে সরাসরি না করে দিন। মনে রাখবেন, কোনো সৎ মিডিয়া বিয়ের আগে লাখ লাখ টাকা দাবি করবে না।
- ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার: বর্তমানে বাংলাদেশে বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন ডিজিটাল করার প্রক্রিয়া চলছে (২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী)। সরকারি পোর্টাল বা কাবিননামা যাচাইয়ের অনলাইন সুবিধা ব্যবহার করে পাত্র বা পাত্রীর বৈবাহিক অবস্থা নিশ্চিত হয়ে নিন।
বিয়ে সারা জীবনের সিদ্ধান্ত। হুট করে বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে পড়ে বড় সিদ্ধান্ত নেবেন না। কোনো ম্যারেজ মিডিয়া যদি আপনাকে টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেয় বা অসংলগ্ন আচরণ করে, তবে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা ভোক্তা অধিকারের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে যোগাযোগ করুন।









