Home Second Lead রডের বাজারে ওজন ও গ্রেড জালিয়াতি

রডের বাজারে ওজন ও গ্রেড জালিয়াতি

আপনি কি সঠিক ‘টন’ ও ‘টান’ পাচ্ছেন?

সিরিজ প্রতিবেদন

পকেটে সিঁধ: ভোক্তার প্রতিদিনের লড়াই 

কামরুল হাসান
বাড়ি নির্মাণের সবচেয়ে দামী এবং গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো এমএস রড (MS Rod)। আমরা রাজমিস্ত্রি বা ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শে টন কে টন রড কিনি। কিন্তু আপনি কি জানেন, যে রডটিকে আপনি ৫০০ গ্রেড বা টিএমটি (TMT) মনে করে কিনছেন, সেটি আসলে সাধারণ গ্রেডের রি-রোলিং মিলের পরিত্যক্ত লোহা থেকে তৈরি? কিংবা ট্রাক থেকে রড নামানোর সময় ‘টনের’ হিসাবে আপনি কত কেজি কম পাচ্ছেন? রডের বাজারে ওজনে কম দেওয়া এবং নিম্নমানের স্ক্র্যাপ লোহার ব্যবহার এখন বড় এক আতঙ্কের নাম।
বিজনেসটুডে২৪-এর অনুসন্ধানে রডের বাজারের কিছু ভয়ংকর কারসাজি বেরিয়ে এসেছে।
রডের বাজারে যেভাবে চলে ‘ভারী জালিয়াতি’
১. ডিজিটাল মিটারে ওজন চুরি: ট্রাক ভর্তি রড যখন পাল্লায় মাপা হয়, তখন অনেক সময় আগে থেকেই মিটারে ‘রিমোট কন্ট্রোল’ বা সফটওয়্যার কারসাজি করা থাকে। আপনার চোখের সামনে ১০ টন দেখালেও বাস্তবে হয়তো আছে ৯.৫ টন। অর্থাৎ কেবল এক ট্রাকেই আপনি ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকার রড কম পাচ্ছেন। আবার রড নামানোর সময় বান্ডিল থেকে কৌশলে ২-৩টি রড সরিয়ে রাখার অভিযোগও পুরনো নয়।
২. গ্রেড ও পিএসআই (PSI) জালিয়াতি: বর্তমানে বাজারে ৫০০ ডব্লিউ বা ৬০ গ্রেডের রডের চাহিদা বেশি। অসাধু বিক্রেতারা সাধারণ ৪০ গ্রেড বা নিম্নমানের লোকাল রডের গায়ে মেশিনের সাহায্যে ‘500W’ বা নামী ব্র্যান্ডের সিল মেরে দেয়। এই রডের নমনীয়তা (Ductility) কম থাকে, ফলে ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে এই রড দ্রুত ভেঙে যায় এবং ভবন ধসে পড়ে।
৩. মরিচা ধরা ও পুরনো রড: খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা বা বৃষ্টির পানিতে ভেজা মরিচা ধরা রড ব্রাশ দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করে নতুন বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। মরিচা ধরা মানেই রডের আয়তন ও শক্তি কমে যাওয়া। এমন রড সিমেন্টের সাথে ঠিকমতো ‘বন্ডিং’ তৈরি করতে পারে না, যা ঢালাইয়ের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে।
৪. ব্যাসের (Diameter) কারসাজি: আপনি হয়তো ১৬ মিলিমিটার রড অর্ডার দিয়েছেন, কিন্তু বিক্রেতা কৌশলে ১৫.৫ বা ১৫.২ মিলিমিটারের রড গছিয়ে দিল। খালি চোখে এই সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরা কঠিন, কিন্তু পুরো ভবনের লোড ক্যালকুলেশনে এটি বড় ধরণের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
রড কেনার সময় প্রতারণা এড়াতে যা করবেন:
  • খুচরা ওজন যাচাই: পুরো ট্রাকের ওজনের ওপর ভরসা না করে অন্তত একটি বান্ডিল খুলে রডের সংখ্যা গুনে নিন এবং ফিতা দিয়ে রডের দৈর্ঘ্য মেপে দেখুন। রডের গায়ে খোদাই করা ব্র্যান্ডের নাম ও গ্রেড স্পষ্ট কি না যাচাই করুন।
  • ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট: দামী বা বড় প্রকল্পের জন্য রড কেনার আগে বুয়েট (BUET) বা স্বীকৃত ল্যাব থেকে রডের ‘টেনসিল স্ট্রেন্থ’ (Tensile Strength) ও ‘বেন্ড টেস্ট’ করিয়ে নিন। ডিলারের দেওয়া রিপোর্টের ওপর অন্ধবিশ্বাস করবেন না।
  • মরিচা ও ফাটল পরীক্ষা: রডের গায়ে কোনো ধরণের ফাটল বা খসখসে লাল মরিচা আছে কি না দেখুন। রড বাঁকা করলে যদি সেখানে সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দেয়, তবে বুঝবেন সেই রডের মান অত্যন্ত নিম্ন।
  • নির্ভরযোগ্য ডিলার: সব সময় কোম্পানির অনুমোদিত ডিলার বা সরাসরি মিল থেকে রড কেনার চেষ্টা করুন। রাস্তার ধারের নামহীন দোকান থেকে সস্তায় রড কেনা মানে নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া।
রড ও সিমেন্টে ছাড় দেওয়া মানে নিজের কবর নিজে খোঁড়া। ওজনে কম বা নিম্নমানের রড সরবরাহ করলে ভোক্তা অধিকার বা স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য নিন। মনে রাখবেন, রড একবার ঢালাইয়ের ভেতর ঢুকে গেলে তা আর সংশোধনের উপায় থাকে না।
রড কিনতে গিয়ে আপনি কি কখনো ওজন বা মান নিয়ে প্রতারিত হয়েছেন? আমাদের কমেন্টে জানান।