Home First Lead পলি জমার থাবায় শঙ্খ মোহনা: হুমকির মুখে ব্লু-ইকোনমি

পলি জমার থাবায় শঙ্খ মোহনা: হুমকির মুখে ব্লু-ইকোনমি

ছবি: এ আই
কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ইমেজ ও মরফোলজিক্যাল ডাটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোহনার মোহনার উত্তর ও দক্ষিণ উভয় পাশেই নতুন নতুন বালুচর জেগে উঠছে। উজানের সাঙ্গু (শঙ্খ) নদী থেকে আসা পলি এবং সমুদ্রের জোয়ারের সাথে আসা বালুর সংমিশ্রণে মোহনার মুখে একটি ‘সাব-মেরিন ডেল্টা’ বা ডুবো চরের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানির গড় গভীরতা বা ড্রাফট অনেক সময় ৩ মিটারের নিচে নেমে আসে, যা বাণিজ্যিক ফিশিং ট্রলার চলাচলের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।
মৎস্য অর্থনীতিতে এর বহুমুখী প্রভাব

শঙ্খ মোহনার এই নাব্যতা সংকট কেবল একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, এটি সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতির রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে।

পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি: মোহনায় নাব্যতা না থাকায় বড় ট্রলারগুলো সরাসরি ঘাটে ভিড়তে পারে না। ফলে মাঝসমুদ্রে ছোট নৌকায় মাছ খালাস করে জেটিতে আনতে হয়, যা অপারেশনাল কস্ট বা পরিচালনার খরচ প্রায় ২০-৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গুণমান নষ্ট হওয়া: মাছ খালাসে বিলম্ব হওয়ার কারণে ‘কোল্ড চেইন’ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পচনশীল সামুদ্রিক মাছের গুণমান কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর রফতানি মূল্য হ্রাস পাচ্ছে।
অব্যবহৃত সম্ভাবনা: বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপকূলীয় অঞ্চলে প্রস্তাবিত ফিশ প্রসেসিং জোনগুলো এই পলি জমার ভয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

কারিগরি চ্যালেঞ্জ ও নদী শাসনের প্রয়োজনীয়তা

বিশেষজ্ঞদের মতে, শঙ্খ নদীর মরফোলজি অত্যন্ত অস্থির হওয়ার মূল কারণ হলো এর তীব্র বাঁক এবং পানির প্রবাহের অনিয়মিত গতি। জেটি রক্ষার জন্য কেবল ড্রেজিং সমাধান নয়, কারণ ড্রেজিং করার কয়েক মাসের মধ্যেই পুনরায় পলি জমে ভরাট হয়ে যায় (Back-filling)। এখানে প্রয়োজন ‘গাইড ওয়াল’ বা ‘ব্রেক-ওয়াটার’ নির্মাণ করা, যা সমুদ্রের ঢেউ ও বালুর অনুপ্রবেশ ঠেকাবে।

এছাড়া, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড় থেকে আসা পলির পরিমাণ গত ৫ বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। এটি জেটি নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জায়গার স্থায়িত্বকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

দীর্ঘমেয়াদী টেকসই পরিকল্পনার প্রস্তাবনা

১. ত্রিমাত্রিক মডেলিং: জেটি স্থাপনের আগে ফিজিক্যাল এবং গাণিতিক (Mathematical Modeling) সিমুলেশন ব্যবহার করে দেখা প্রয়োজন আগামী ২০ বছরে পলি জমার সম্ভাব্য গতিপথ কী হবে। ২. পলি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র: মোহনা এলাকায় একটি স্থায়ী ড্রেজিং ইউনিট বা ‘সেডিমেন্ট ট্র্যাপ’ স্থাপন করা যেতে পারে, যা নিয়মিতভাবে পলি অপসারণ করে চ্যানেলকে সচল রাখবে। ৩. ইন্টিগ্রেটেড কোস্টাল ম্যানেজমেন্ট: বন বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয়ে উপকূলীয় বনায়ন বৃদ্ধি করতে হবে যাতে তটরেখার ক্ষয় রোধ হয় এবং মাটির স্থায়িত্ব বাড়ে।

শঙ্খ মোহনার এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জকে বিজ্ঞানের আলোতে মোকাবিলা করতে পারলে এটি কেবল চট্টগ্রামের নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের নীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হবে।

তথ্যসূত্র:

  • ১. মর্ফোলজিক্যাল স্টাডি রিপোর্ট [কোড: ১.৩.৯]: শঙ্খ নদীর মোহনার ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও পলি জমার হার বিশ্লেষণ সংক্রান্ত বিশেষ গবেষণাপত্র (২০২৪-২৫)।
  • ২. হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে ডাটা: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BIWTA) এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পরিচালিত শঙ্খ মোহনার নাব্যতা ও ড্রাফট সংক্রান্ত বার্ষিক জরিপ।
  • ৩. মৎস্য ও ব্লু-ইকোনমি কৌশলপত্র: সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর এবং উপকূলীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির যৌথ প্রতিবেদন (দক্ষিণ চট্টগ্রাম অঞ্চল)।
  • ৪. সেডিমেন্টেশন ও রিভার ইঞ্জিনিয়ারিং রিপোর্ট: শঙ্খ  অববাহিকার নদী শাসন ও ক্যাপিটাল ড্রেজিং বিষয়ক কারিগরি সমীক্ষা।
  • ৫. ফিল্ড অবজারভেশন: আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকার স্থানীয় মৎস্যজীবী ও জেটি প্রকল্পের অংশীজনদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎকার ও সরেজমিন পর্যবেক্ষণ।

আরও নিয়মিত তথ্য পেতে এবং এ বিষয়ে আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং মন্তব্য করুন।