বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, সিলেট:
প্রকৃতি যেমন সিলেটকে দিয়েছে পাহাড়-নদী আর চা-বাগানের সৌন্দর্য, তেমনি এই অঞ্চলের রান্নাঘরও দিয়েছে অমূল্য এক রসনার দুনিয়া। শুঁটকির ঝাঁঝালো ঘ্রাণ, সাতকরার তীব্র টক, হাক পাতার ভর্তার কোমলতা কিংবা মাছের টকে মাখা এক চামচ ভাত—সবকিছু মিলিয়ে সিলেট যেন রসনার এক আত্মিক ভ্রমণ।
সিলেটের প্রতিটি পদ একেকটি গল্প বলে। যেমন সাতকরা ফলটির টক আর ঘ্রাণে যে মাংস রান্না হয়, তা শুধু খাদ্য নয়, এক অভিজ্ঞতা। শুঁটকি এখানে শুধুই উপকরণ নয়, বরং এক আবেগ। চুলায় কষানো লইট্টা শুঁটকি বা পেঁয়াজ-মরিচে মাখানো বোম্বাই শুঁটকি ভর্তা—যার এক চামচে চোখ বুজে বলা যায়, “এটা সিলেট”।
রান্নায় ব্যবহৃত উপকরণ যেমন দেশি, রান্নার ধরণও তেমনি ঘরোয়া। সরষের তেল, কাঁচা মরিচ, রসুন, ধনেপাতা সবকিছুর একটা নিজস্ব ছন্দ রয়েছে, যেন মাটির ঘ্রাণ গায়ে মেখে খাবার এসে পৌঁছায় থালায়।
শুধু ঘরের ভেতরেই নয়, শহরের নানা প্রান্তে রেস্তোরাঁগুলোও এই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। জিন্দাবাজারের “পাঁচ ভাই” কিংবা আম্বরখানার “পানসী” সাতকরা গরুর মাংস, টেংরা মাছের টক, শুঁটকি তরকারি আর দেশি ভর্তার প্লেট যেন সবসময় অপেক্ষায় থাকে রসনাপরীক্ষায় আসা অতিথির জন্য।

পল্লী খাবার ঘরের নাম শুনলেই মনে পড়ে গ্রামীণ রান্নার ঘ্রাণ, যেখানে কম দামে মেলে আসল স্বাদ। খাদিমনগরের নন্দন পার্কের পাশে বসে চা বাগানের সবুজে ঘেরা পরিবেশে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সাতকরা মাংস খাওয়ার মুহূর্তটা যেন জীবনের এক রসায়ন।
এই রসনা ভ্রমণ থেমে থাকে না শুধু সিলেটেই। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী সিলেটিরা তাঁদের সঙ্গে নিয়ে গেছেন এই খাবারের পরিচয়ও। লন্ডনের কোনো ব্যস্ত রেস্তোরাঁয় যদি হঠাৎ ‘সাতকরা বিফ কারি’ লেখা দেখতে পান, জানবেন সিলেট এখন শুধু একটি জায়গা নয়, এটি একটি স্বাদ।
রসনার এই যাত্রায় যারা অংশ নেয়, তারা বোঝে সিলেটের খাবার কেবলমাত্র খাবার নয়। প্রতিটি পদে রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি আর আবেগ। এমনকি এক টুকরো চাকি পিঠা বা এক কাপ লেয়ার চাও বলে দেয় এখানকার মানুষ কতটা অতিথিপরায়ণ, কতটা নিজের ঐতিহ্যে গর্বিত।
সিলেটের খাবার যেন এক নিজস্ব ছন্দে চলা কাব্য যেখানে ঘ্রাণ, স্বাদ আর অভিজ্ঞতা মিশে তৈরি হয় অনন্য এক ঐতিহ্য। আর সেই ঐতিহ্যের ছোঁয়াই আজও মানুষকে টেনে আনে হাক পাতার ঘ্রাণ, শুঁটকির ঝাঁঝ কিংবা সাতকরার সুরে বাঁধা ভাতের প্লেটের কাছে।










