কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: জাপানের গাড়ি নিলাম বাজার এবং রপ্তানি প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল কড়াকড়ির বড় এবং ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বাজারে। বাংলাদেশ প্রতি বছর জাপান থেকে বিপুল পরিমাণ রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি করে, যার বড় অংশই খালাস হয় চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে।
অডোমিটার জালিয়াতি ও ভুয়া অকশন শিট বন্ধে জাপানি রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনগুলোর নেওয়া কঠোর পদক্ষেপের ফলে দেশের অটোমোবাইল খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) থেকে জাপানি গাড়ি রপ্তানিকারকদের শীর্ষ অ্যাসোসিয়েশনগুলো অডোমিটার জালিয়াতি এবং ভুয়া অকশন শিট পুরোপুরি বন্ধ করতে এই নজিরবিহীন প্রযুক্তিগত রূপান্তর চালু করেছে।
বর্তমানে প্রতিটি গাড়ির জন্য ইউনিক কিউআর কোড সংবলিত ডিজিটাল “বার্থ সার্টিফিকেট” বা প্রকৃত অকশন হিস্ট্রি সার্ভারে এন্ট্রি করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর তা বর্তমান সময়ে এসে বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কী এই নতুন ব্যবস্থা এবং কীভাবে কাজ করছে?
অতীতে নিলামের মূল কাগজ বা অকশন শিট জালিয়াতি করে ‘আর গ্রেড’ (দুর্ঘটনা কবলিত) গাড়িকে ‘৪ বা ৪.৫ গ্রেড’ বানিয়ে কিংবা লাখ কিলোমিটার চলা গাড়িকে মাত্র ২০-৩০ হাজার কিলোমিটার দেখিয়ে বিক্রি করা হতো। নতুন নিয়মে এই ফাঁকফোকর পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে:
সরাসরি অকশন সার্ভার লিংক: গাড়ি জাপানের পোর্ট ছাড়ার আগেই রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে ওই গাড়ির চেসিস নম্বর দিয়ে প্রকৃত অকশন হিস্ট্রি এন্ট্রি করতে হচ্ছে।
ডিজিটাল বার্থ সার্টিফিকেট: প্রতিটি গাড়ির জন্য একটি ইউনিক কিউআর (QR) কোড সংবলিত ডিজিটাল সার্টিফিকেট ইস্যু করা হচ্ছে। এই কোড স্ক্যান করলেই জাপানের USS, TAA বা JU নিলামের মূল সার্ভারে গাড়িটি বিক্রির সময় ঠিক কী কন্ডিশনে ছিল, তা লাইভ দেখা যাচ্ছে। ফলে মাঝপথে কাগজ পরিবর্তনের কোনো সুযোগ থাকছে না।
ক্রেতা পর্যায়ে স্বস্তি ও প্রকৃত মাইলেজ নিশ্চিত
বাংলাদেশের বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল, জাপান থেকে কম দামে বেশি মাইলেজের গাড়ি এনে ঢাকার শোরুমগুলোতে ওডোমিটার রিওয়াইন্ড বা মিটার টুইকিং করে কম মাইলেজ দেখিয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হতো। জাপানের এই ডিজিটাল কড়াকড়ির ফলে এখন বাংলাদেশের ক্রেতারা শোরুমে বসেই মোবাইল অ্যাপ বা কিউআর কোডের মাধ্যমে গাড়িটির আসল মাইলেজ ও অকশন গ্রেড দেখতে পাচ্ছেন। সরাসরি জাপানি সার্ভার থেকে তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ক্রেতা ঠকার ঝুঁকি এখন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
শুল্ক ফাঁকি রোধ ও রাজস্ব বৃদ্ধি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং কাস্টমস কর্তৃপক্ষের জন্য এই নতুন নিয়ম বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। আগে অনেক আমদানিকারক দুর্ঘটনা কবলিত বা কম গ্রেডের ভুয়া অকশন শিট দেখিয়ে কম শুল্কে গাড়ি খালাস করার চেষ্টা করতেন। এখন কাস্টমস কর্মকর্তারা সরাসরি জাপানি অ্যাসোসিয়েশনের ডিজিটাল ভেরিফিকেশন সিস্টেম ব্যবহার করে গাড়ির প্রকৃত মূল্য ও গ্রেড যাচাই করতে পারছেন। এতে শুল্ক ফাঁকি পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে এবং সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে জাপানের এই কঠোর পদক্ষেপের কারণে সাময়িকভাবে জালিয়াতি করা সস্তা গাড়ির সরবরাহ বাজারে কিছুটা কমলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বাংলাদেশের বাজারে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনবে। ক্রেতারা এখন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ডাস্টবিন বা ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি কেনার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন এবং বাজারে জেনুইন বা প্রকৃত ভালো মানের গাড়ির সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে।
শিল্প, বাণিজ্য ও অটোমোবাইল খাতের এমন সব এক্সক্লুসিভ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন ও সর্বশেষ আপডেট নিয়মিত পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com