Home বিনোদন ধরলা তীরের ঈদ: গ্রামবাংলার সেকাল ও একাল

ধরলা তীরের ঈদ: গ্রামবাংলার সেকাল ও একাল

ছবি এ আই
নয়ন দাস, কুড়িগ্রাম: রাজারহাট উপজেলার উমর মজিদ ইউনিয়নের একটি নিভৃত গ্রাম। একসময় যেখানে ঈদের চাঁদ দেখা গেলে কাঁসর পিটিয়ে বা টিনের কৌটা বাজিয়ে জানান দেওয়া হতো, আজ সেখানে স্মার্টফোনের টুংটাং শব্দে ঈদের বার্তা পৌঁছায়। ধরলা নদীর চরাঞ্চল আর সবুজ শস্যক্ষেতের মাঝে ঈদের এই বিবর্তন এক গভীর জীবনবোধের গল্প বলে।
সেকালের চিলমারী ও রাজারহাটের ঈদ: প্রাণের টান
পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রবীণ কৃষক আব্দুল জলিল মিয়া। নিজের কৈশোরের কথা মনে করে তিনি বলেন:

“কুড়িগ্রামে তখন যোগাযোগ বলতে ছিল পায়ে হাঁটা পথ বা নৌকা। ঈদের আগের রাতে গরুর গাড়ির চাকার আওয়াজ পাওয়া যেত, যারা শহর থেকে ফিরত। আমরা ছোটরা ধরলার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম চাঁদ দেখার জন্য। কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘সিদলের ভর্তা’ আর আউশ চালের সেমাই ছিল ঈদের সকালের প্রধান খাবার। সেকালে ঈদের সালামি হিসেবে এক আনা বা চার আনা পেলেই মনে হতো আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছি।”

সে সময় কুড়িগ্রামের গ্রামগুলোতে ঈদের নামাজ শেষে বসত বিশাল ‘গাজীর গান’ বা ‘পালা গানের’ আসর। গ্রামের মোড়লদের বাড়িতে বড় বড় ডেকচিতে রান্না হতো খাসির মাংস আর খিচুড়ি, যা সবাই মিলে বারান্দায় বসে কলাপাতায় খেত।
একালের ঈদ: উন্নয়ন ও যান্ত্রিকতার ছোঁয়া
বর্তমানে কুড়িগ্রামের সেই মেঠো পথগুলো এখন পাকা হয়েছে। ঘরে ঘরে পৌঁছেছে বিদ্যুৎ। স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা তৌফিকুল ইসলাম বলেন: “এখন কুড়িগ্রামের গ্রামেও শহরের হাওয়া লেগেছে। আগে আমাদের মায়েরা সারা রাত জেগে হাতে পিঠা কাটতেন, এখন বাজার থেকে কেনা লাচ্ছা সেমাইয়ের প্যাকেটই ভরসা। এখন ঈদের নামাজ শেষে ছেলেরা মিলে ধরলা ব্রিজে গিয়ে সেলফি তোলে, মোটরবাইক নিয়ে এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় ঘুরতে যায়। আনন্দের ধরনটা এখন অনেক বেশি ‘ভার্চুয়াল’ হয়ে গেছে।”
তবে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে এখনো দারিদ্র্যের ছাপ থাকলেও ত্যাগের মহিমায় কোনো কমতি নেই। এখন কুরবানির ঈদে কুড়িগ্রামের বিশাল বিশাল পশুর হাটগুলো সারা দেশের নজরে থাকে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।
প্রধান পার্থক্যের এক নজরে
বিষয় সেকালের কুড়িগ্রাম (প্রথা) একালের কুড়িগ্রাম (আধুনিকতা)
যোগাযোগ নৌকা, গরুর গাড়ি বা পায়ে হাঁটা। মোটরবাইক, অটোরিকশা ও পাকা রাস্তা।
সালামি এক আনা, দুই আনা বা নতুন কড়কড়ে নোট। বিকাশ বা নগদ-এর মাধ্যমে ডিজিটাল সালামি।
খাওয়া-দাওয়া আউশ চালের সেমাই, সিদল ও দেশি ঘি। প্যাকেটজাত লাচ্ছা, বিরিয়ানি ও কোল্ড ড্রিঙ্কস।
বিনোদন লাঠিখেলা, জারি গান ও মেলা। সিনেমা হল, ইউটিউব ও ফেসবুক লাইভ।
কুড়িগ্রামের ধরলা তীরের মানুষগুলো এখনো সহজ-সরল। যদিও প্রযুক্তি তাদের জীবনধারা বদলে দিয়েছে, তবুও ঈদের দিন একে অপরের বাড়িতে গিয়ে মুখে হাসি ফোটানোর রীতিটা এখনো টিকে আছে। সেকালের সেই শান্ত স্নিগ্ধতা হয়তো এখন আর নেই, কিন্তু কুড়িগ্রামের মাটির গন্ধে যে আত্মীয়তা মিশে আছে, তা আজও অমলিন।