Home আন্তর্জাতিক ব্লু ইকোনমির বিষফোঁড়া: সোমালি জলদস্যুতার নেপথ্যে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট

ব্লু ইকোনমির বিষফোঁড়া: সোমালি জলদস্যুতার নেপথ্যে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট

শামসুল ইসলাম, ঢাকা: ভারত মহাসাগরের অতল জলরাশি যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধমনী হিসেবে কাজ করছে, ঠিক তখনই সোমালি উপকূলে জলদস্যুতার পুনরুত্থান বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের দুটি জাহাজ—’এমভি আবদুল্লাহ’ এবং এর আগে ‘এমভি জাহান মণি’—ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল গুটিকয়েক সশস্ত্র যুবকের হঠকারিতা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে লন্ডন থেকে দুবাই পর্যন্ত বিস্তৃত এক সুশৃঙ্খল অপরাধ নেটওয়ার্ক।
নীল সমুদ্রের ‘সাদা কলার’ অপরাধী
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO) এবং ইন্টারপোলের বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, সোমালি জলদস্যুতা একটি ত্রি-স্তরীয় মডেলের ওপর ভিত্তি করে চলে।
প্রথম স্তরে থাকে সোমালিয়ার স্থানীয় লজিস্টিক জোগানদাতা ও মাঠপর্যায়ের সশস্ত্র দস্যুরা।
দ্বিতীয় স্তরে থাকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী, যারা নাইরোবি বা জিবুতিতে বসে মালিকপক্ষের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখে।
তৃতীয় ও সবচেয়ে শক্তিশালী স্তরে থাকে আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী বা ‘কিংপিন’।
ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম (UNODC)-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মুক্তিপণের অর্থের একটি বড় অংশ (প্রায় ৩০-৫০%) চলে যায় এই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের পকেটে, যারা লন্ডনের মতো বাণিজ্যিক শহরগুলোর শিপিং ডেটাবেজে প্রবেশাধিকার রাখে। এরা আগে থেকেই দস্যুদের জানিয়ে দেয় কোন জাহাজটিতে সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী নেই এবং কার বীমা কভারেজ সবচেয়ে বেশি।
 মুক্তিপণ: আকাশ থেকে পড়া কোটি কোটি ডলার
জলদস্যুদের মুক্তিপণ আদায়ের প্রক্রিয়াটি কোনো থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কম নয়। বাংলাদেশের জাহাজগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, মালিকপক্ষ ও দস্যুদের মধ্যে দীর্ঘ দরকষাকষির পর একটি চূড়ান্ত অংক নির্ধারিত হয়।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘ড্রায়াড গ্লোবাল’ (Dryad Global)-এর তথ্যমতে, জলদস্যুরা এখন আর সাধারণ ব্যাংক ট্রান্সফার গ্রহণ করে না। তারা প্যারাশুটের মাধ্যমে ছোট বিমানে করে ‘ক্যাশ ড্রপ’ পদ্ধতিতে অর্থ নেয়। নোটগুলো হতে হয় খাঁটি মার্কিন ডলার এবং সেগুলোর সিরিয়াল নম্বর যেন ট্রেস করা না যায়, সেজন্য দস্যুদের নিজস্ব ‘মানি স্ক্যানার’ বিশেষজ্ঞ থাকে।
মধ্যস্থতার জটিল মারপ্যাঁচ
সোমালি জলদস্যুতার ক্ষেত্রে ‘লন্ডন কানেকশন’ একটি ওপেন সিক্রেট। লন্ডনের ‘লয়েডস অফ লন্ডন’ (Lloyd’s of London)-এর মতো বীমা কোম্পানিগুলো সরাসরি দস্যুদের সাথে কথা বলে না। তারা পেশাদার রিভলভিং এবং নেগোশিয়েশন ফার্ম নিয়োগ করে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরাসরি মুক্তিপণ দেওয়া অনেক দেশে নিষিদ্ধ থাকলেও ‘ক্রু সেফটি মানি’ বা ‘স্যালভেজ কস্ট’ হিসেবে এই লেনদেনকে বৈধতা দেওয়া হয়। এটি জলদস্যুদের জন্য একটি লাভজনক ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হয়েছে।
 আন্তর্জাতিক উদ্বেগের নতুন কেন্দ্রবিন্দু
বিগত কয়েক মাসে লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণের পর আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নজর সেদিকে সরে যাওয়ায় সোমালি উপকূলে এক ধরনের ‘নিরাপত্তা শূন্যতা’ তৈরি হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো (IMB)-এর সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সোমালি জলদস্যুরা এখন বড় জাহাজের পাশাপাশি মাছ ধরার ট্রলার জিম্মি করে সেগুলোকে ‘মাদার ভেসেল’ হিসেবে ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রে অপারেশন চালাচ্ছে।
সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সমুদ্রে পাহারা দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অর্থপাচার ও তথ্যের জোগানদাতা সাদা কলার অপরাধীদের শনাক্ত করা না যাবে, ততক্ষণ সোমালি উপকূল অশান্তই থাকবে।

তথ্যসূত্র:
  • ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো (IMB) পাইরেসি রিপোর্টিং সেন্টার।
  • ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম (UNODC) রিপোর্ট ২০২৪-২৬।
  • ড্রায়াড গ্লোবাল মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স।

businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানান।