দীর্ঘ কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও সামরিক উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে উন্মুক্ত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’। সুইজারল্যান্ডের মধ্যস্থতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি সফল ও ফলপ্রসূ বৈঠকের পর এই জলসীমা দিয়ে পুনরায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে প্রণালীটি খুলে দেওয়া হলেও গত কয়েক সপ্তাহের অচলাবস্থার কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক শিপিং সংকট এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
আন্তর্জাতিক বীমা জায়ান্ট আলিয়াঞ্জের (Allianz) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী এই অচলাবস্থার কারণে হরমুজ প্রণালী ও এর আশেপাশের জলসীমায় এখনো প্রায় ১,২০০টিরও বেশি পণ্যবাহী কার্গো ও মাদার ভেসেল অবরুদ্ধ অবস্থায় আটকা পড়ে রয়েছে। সাগরে ভাসমান এই বিশাল জাহাজবহরে আটকে থাকা আমদানিকৃত পণ্যের আর্থিক মূল্য প্রায় ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সাথে, এসব জাহাজে কর্মরত প্রায় ১১,০০০ আন্তর্জাতিক নাবিক এক মানবিক ও মানসিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন, যাদের নিরাপদে উদ্ধার ও গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছে জাতিসংঘের বিশেষায়িত শিপিং এজেন্সি ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন ।
সুইজারল্যান্ড বৈঠক ও ভূ-রাজনৈতিক বরফ গলন
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত এই প্রণালীটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের গোপন ও জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, উভয় পক্ষই সামুদ্রিক বাণিজ্যকে সামরিক বা রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে রাখার ব্যাপারে একমত হয়েছে। এই সমঝোতার পরপরই হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
সাগরে ১২৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য জট
জলপথটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত ঘোষণা করা হলেও এর সুফল পেতে আরও বেশ কিছু দিন সময় লাগবে বলে মনে করছেন মেরিটাইম বিশেষজ্ঞরা। আলিয়াঞ্জের লজিস্টিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, আকস্মিক অচলাবস্থার কারণে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী সংযোগস্থলে জাহাজের এক নজিরবিহীন জট তৈরি হয়েছে।
১,২০০টিরও বেশি জাহাজে থাকা জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG), তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক্স এবং শিল্পকারখানার জরুরি কাঁচামাল সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক দেশের উৎপাদন খাত এই কাঁচামাল সংকটের কারণে স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
১১ হাজার নাবিকের মানবিক সংকট ও জাতিসংঘের তৎপরতা
অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জাহাজে থাকা হাজার হাজার ক্রু ও নাবিকদের জীবন নিয়ে। দীর্ঘ দিন সাগরে অবরুদ্ধ থাকায় অনেক জাহাজে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং জরুরি ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (IMO) জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশের প্রায় ১১,০০০ নাবিক এই মুহূর্তে ওই অঞ্চলে অবরুদ্ধ রয়েছেন। জাতিসংঘের শিপিং এজেন্সি স্থানীয় কোস্টগার্ড এবং আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর সাথে সমন্বয় করে আটকে পড়া নাবিকদের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পাশাপাশি জাহাজগুলোকে দ্রুত ক্লিয়ারেন্স দিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে পাঠানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করছে।
বাজারের ওপর প্রভাব
হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করলেও শিপিং ফ্রেইট রেট বা জাহাজ ভাড়ার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব এখনই কাটছে না।
শিপিং লাইন্সগুলোর মতে, এই বিশাল জট পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে অন্তত কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে, যার ফলে এশিয়া ও ইউরোপের প্রধান বন্দরগুলোতে এর চেইন রিঅ্যাকশন বা শিডিউল বিপর্যয় অব্যাহত থাকবে।
বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক শিপিং আপডেট এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির এমন সব গুরুত্বপূর্ণ ও অনুসন্ধানী খবরাখবর নিয়মিত পেতে businesstoday24.com ফলো করুন