সিরিজ প্রতিবেদন
পকেটে সিঁধ: ভোক্তার প্রতিদিনের লড়াই
কামরুল হাসান
সকালবেলা থলে হাতে বাজারে গিয়ে এক কেজি গরুর মাংসের অর্ডার দিলেন। চোখের সামনেই কসাই মাংস কাটলেন, পাল্লায় মাপলেন। আপনি হাসিমুখে টাকা মিটিয়ে বাড়িতে ফিরলেন এই ভেবে যে, আজ অন্তত পরিবারকে ভালো এক টুকরো মাংস খাওয়াতে পারবেন। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটল রান্নাঘরে।
থলে উপুড় করতেই দেখা গেল মাংসের চেয়ে হাড় আর চর্বির স্তূপই বেশি। যে দাম আপনি দিয়েছেন সলিড মাংসের জন্য, সেই দামে আসলে আপনি কিনে এনেছেন বাজারের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট। এটা কেবল আপনার একার গল্প নয়, আমাদের দেশের কোটি ভোক্তার প্রতিদিনের নীরব হাহাকার। বিজনেসটুডে২৪-এর এই বিশেষ সিরিজের প্রথম পর্বে আজ আমরা তুলে ধরব মাংসের বাজারে চলমান সুকৌশলী প্রতারণার বিস্তারিত।
১. হাড় ও চর্বির ‘জোরপূর্বক’ অন্তর্ভুক্তি: বাজারে সলিড মাংসের দাম এবং হাড়সহ মাংসের দামের মধ্যে পার্থক্য থাকে। কিন্তু অধিকাংশ দোকানেই দেখা যায়, সলিড মাংস চাইলেও কসাই কৌশলে বড় এক টুকরো চর্বি বা হাড় পাল্লায় তুলে দেন। প্রতিবাদ করলে উত্তর আসে— “গরু কি কেবল মাংসেরই হয়? হাড়-চর্বি তো নিতেই হবে।” অথচ আপনি যে চর্বিটুকু নিচ্ছেন, তা রান্নার সময় গলে তেলের মতো হয়ে যায়, যা কার্যত আপনার কেনা ওজনের অপচয়।
২. হাড় গুঁজে দেওয়া : অনেক অসাধু বিক্রেতা মাংস কাটার সময় কৌশলে মাংসের বড় টুকরোর ভেতরে ছোট ছোট হাড়ের টুকরো ঢুকিয়ে দেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে নিরেট মাংস, কিন্তু বাসায় নিয়ে কাটতে গেলেই বেরিয়ে আসে লুকানো হাড়। এভাবে এক কেজি মাংসে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম পর্যন্ত বাড়তি হাড় ধরিয়ে দেওয়া হয়।
৩. মাংসে পানির কারসাজি: অনেক সময় দেখা যায় কসাইরা দীর্ঘক্ষণ মাংস ঝুলিয়ে রাখেন এবং বারবার পানি ছিটান। এতে মাংস দেখতে তাজা মনে হলেও ফাইবারগুলো পানি শুষে নেয়। ফলে মাংসের ওজন বেড়ে যায়। আপনি যখন ১ কেজি মাংস কিনছেন, তার একটি বড় অংশই আসলে পানি।
৪. ডিজিটাল মিটারের ‘জাদু’: এনালগ পাল্লায় কারচুপি ধরা সহজ হলেও ডিজিটাল মিটারে তা কঠিন। অনেক বিক্রেতা মিটারের নিচে চুম্বক লাগিয়ে রাখেন অথবা ওজন দেওয়ার সময় কৌশলে হাতের চাপ প্রয়োগ করেন। এতে চোখের নিমেষেই ১০০-২০০ গ্রাম ওজন বেশি দেখায়।
ভোক্তার সচেতনতা: কীভাবে বাঁচবেন?
প্রতারণা থেকে বাঁচতে ভোক্তা হিসেবে আপনার বেশ কিছু করণীয় আছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে–
সতর্ক নজরদারি: কসাই যখন মাংস কাটছেন, তখন তার হাতের নড়াচড়ার দিকে খেয়াল রাখুন। হাড় বা চর্বি দেওয়ার সময় সাথে সাথেই প্রতিবাদ করুন।
আগে ভাগ করে নিন: মাংস ওজন করার আগে হাড় ও চর্বির পরিমাণ নিয়ে কথা বলে নিন। সলিড মাংসের জন্য প্রয়োজনে কিছু বাড়তি দাম দিয়ে হলেও হাড়মুক্ত মাংস নিশ্চিত করুন।
ওজন যাচাই: সন্দেহ হলে বাজারের নির্দিষ্ট ‘ডিজিটাল ওয়েট স্কেল’ বা অন্য কোনো দোকানে ওজন পুনরায় যাচাই করুন।
রসিদ সংগ্রহ: সবসময় কেনাকাটার পর সম্ভব হলে ছোট একটি চিরকুট বা রসিদ চেয়ে নিন, যাতে পরবর্তী সময়ে অভিযোগ করতে সুবিধা হয়।
আইন কী বলে? ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী— ওজনে কম দেওয়া বা সেবার ক্ষেত্রে প্রতারণা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে বিক্রেতাকে জেল বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।
আগামী পর্বে থাকছে: মাছের বাজারে কারসাজি: তাজা মাছের নামে কি বিষ আর পানি কিনছেন?









