Home Second Lead ঋণখেলাপিদের ‘আলাদিনের চেরাগ’: সম্পদের কয়েকগুণ ঋণ

ঋণখেলাপিদের ‘আলাদিনের চেরাগ’: সম্পদের কয়েকগুণ ঋণ

 ধরাছোঁয়ার বাইরে প্রভাবশালীরা
আমিরুল মোমেনিন, ঢাকা
দেশের ব্যাংকিং খাতে এখন সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের হলফনামা এবং বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো পিলে চমকানোর মতো। অনেক প্রার্থীর হলফনামায় দেখা গেছে, তাদের মোট সম্পদের বাজারমূল্যের চেয়ে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি। অর্থাৎ, তারা তাদের সামর্থ্যের চেয়ে অনেক বেশি টাকা ব্যাংক থেকে সরিয়ে নিয়েছেন, যা এখন আদায়ের পথ প্রায় রুদ্ধ।
সম্পদ বনাম ঋণ: এক অসম সমীকরণ
অর্থনৈতিক নীতি অনুযায়ী, ব্যাংক সাধারণত সম্পদের জামানত (Collateral) সাপেক্ষে ঋণ প্রদান করে। কিন্তু প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম যেন উল্টো। দেখা গেছে, নামমাত্র কিছু সম্পদ বন্ধক রেখে বা রাজনৈতিক প্রভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। যখন সম্পদের তুলনায় ঋণের অংক অনেক বড় হয়ে যায়, তখন সেই ঋণ আদায়ের কোনো বাস্তব ভিত্তি আর থাকে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি আসলে ঋণের নামে ‘অর্থপাচার’ বা ‘ব্যাংক লুটপাটের’ একটি কৌশল মাত্র।
রিশিডিউলিং: অনিয়মকে নিয়মিত করার হাতিয়ার
বারবার ঋণ পুনর্তফসিল বা রিশিডিউলিং করার মাধ্যমে খেলাপিদের তালিকার বাইরে থাকার এক অদ্ভুত সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
নিয়ম ভাঙার খেলা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ ছাড় ব্যবহার করে নামমাত্র ডাউনপেমেন্ট দিয়ে বারবার ঋণ নিয়মিত করা হচ্ছে।
ফলাফল: এতে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখালেও ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটছে না। উল্টো প্রকৃত খেলাপিরা পুনরায় নতুন করে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
চেক জালিয়াতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
অনেক বড় বড় ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে অসংখ্য চেক জালিয়াতির (NI Act) মামলা রয়েছে। কিন্তু তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক দাপটের কারণে এসব মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে। সাধারণ মানুষ যেখানে সামান্য ঋণের কিস্তি দিতে না পারলে আইনি হয়রানির শিকার হন, সেখানে হাজার কোটি টাকার চেক জালিয়াতি করেও প্রভাবশালীরা নির্বিঘ্নে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এটি সমাজে একটি ভুল বার্তা দিচ্ছে এবং ভালো গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধে নিরুৎসাহিত করছে।
অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ
এই বিশাল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে যাচ্ছে:
তারল্য সংকট: ব্যাংকগুলোতে নগদ টাকার টান পড়ছে, যার ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না।
উচ্চ সুদহার: খেলাপি ঋণের লোকসান মেটাতে ব্যাংকগুলো ভালো গ্রাহকদের ওপর ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিনিয়োগে বাধা: ব্যাংকিং খাতের এই ভঙ্গুর দশা দেখে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাচ্ছেন।
“যখন ঋণের অংক জামানতের চেয়ে বেশি হয়, তখন সেটি আর ব্যাংকিং থাকে না, সেটি হয় লুণ্ঠন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সংস্কৃতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।” — অর্থনীতি বিশ্লেষক
নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতার কারণে কিছু তথ্য বেরিয়ে এলেও এটি হিমশৈলের চূড়া মাত্র। ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে এই ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা সুবিধাভোগী পুঁজিবাদ বন্ধ করতে হবে। ঋণখেলাপিদের প্রকৃত তালিকা প্রকাশ করে তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বয়কট করার পাশাপাশি কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।