Home First Lead সাগরে বিনিয়োগ খরা কাটাতে তোড়জোড়: সংশোধন হচ্ছে ‘মডেল পিএসসি-২০২৫’

সাগরে বিনিয়োগ খরা কাটাতে তোড়জোড়: সংশোধন হচ্ছে ‘মডেল পিএসসি-২০২৫’

ফরিদুল আলম, ঢাকা: দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত ও দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট দূর করতে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে আশার আলো খুঁজছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) আকৃষ্ট করতে বিদ্যমান উৎপাদন বণ্টন চুক্তি বা ‘মডেল পিএসসি-২০২৫’ (Model PSC-2025) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে।

কেন এই তোড়জোড়?
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের মার্চে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের ২৪টি ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো কোম্পানিই চূড়ান্ত প্রস্তাব জমা দেয়নি। এক্সনমবিল, শেভরন ও সিনুকের মতো বিশ্বসেরা কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত পিএসসির বিভিন্ন শর্ত ও আর্থিক অলাভজনক কাঠামোর কারণে পিছিয়ে যায়। এই বিনিয়োগ খরা কাটাতে এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান ‘উড ম্যাকেঞ্জি’র পরামর্শ অনুযায়ী বর্তমান সরকার পিএসসি সংস্কারের হাত দিয়েছে।

নবগঠিত পর্যালোচনা কমিটি
বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসীনকে আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটিতে রাখা হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদদের। কমিটির উল্লেখযোগ্য সদস্যরা হলেন:
অধ্যাপক ড. এম তামিম: উপাচার্য, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।
ড. এস এম মাইকেল কবির: সহযোগী অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ড. সিনথিয়া ফরিদ: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।
প্রকৌশলী মো. শোয়েব: পরিচালক (পিএসসি), পেট্রোবাংলা।
এই কমিটিকে আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে তাদের পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পিএসসিতে যেসব বড় পরিবর্তনের আভাস
সূত্রমতে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনা করে পিএসসিতে কয়েকটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হতে পারে: ১. গ্যাসের দাম: আগে গ্যাসের দাম ফার্নেস অয়েল (HSFO) ভিত্তিক ছিল, যা এখন আন্তর্জাতিক ‘ব্রেন্ট ক্রুড’ অয়েলের দামের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এতে বাজার অনুযায়ী যৌক্তিক দাম পাবে কোম্পানিগুলো। ২. খরচ পুনরুদ্ধার (Cost Recovery): গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আনার উচ্চ খরচ এবং সঞ্চালন চার্জ নিয়ে জটিলতা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ৩. শ্রম আইন ও মুনাফা: কোম্পানির নিট মুনাফার ৫% ‘ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড’ (WPPF)-এ দেওয়ার বিধান নিয়ে আপত্তি ছিল এক্সনমবিলের। এই হার কমানোর বিষয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা চলছে। ৪. আর্থিক ট্রানজেকশন: পেমেন্টের ক্ষেত্রে লাইবরের (LIBOR) পরিবর্তে আধুনিক ‘সোফার’ (SOFR) পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
সমুদ্র জয়ের এক যুগ: প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা জয়ের পর ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেও এক যুগেও উল্লেখযোগ্য গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হয়নি। এর আগে কনোকো ফিলিপস, সান্তোস এবং পস্কো দাইয়ু কাজ শুরু করলেও গ্যাসের দাম ও অন্যান্য শর্ত নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় তারা দেশ ছেড়ে চলে যায়।
আগামী পদক্ষেপ
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা আশা করছেন, কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পিএসসি সংশোধন করা হলে ২০২৫ সালের মধ্যেই নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হবে। বর্তমান জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের নির্দেশনায় এই প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হলে গভীর সমুদ্রের নীল জলরাশির নিচ থেকে গ্যাস উত্তোলন করে দেশের শিল্প ও আবাসিক খাতের জ্বালানি হাহাকার দূর করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।