Home First Lead রূপালি ভাগ্যের ঝিলিক: টেকনাফ উপকূলে ছুরি মাছের ‘বাম্পার হার্ভেস্ট’

রূপালি ভাগ্যের ঝিলিক: টেকনাফ উপকূলে ছুরি মাছের ‘বাম্পার হার্ভেস্ট’

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, টেকনাফ ( কক্সবাজার): টেকনাফের মহেশখালীয়া পাড়া ঘাটে শনিবার বিকেলে যেন উৎসবের আমেজ নেমে এসেছিল। সাগরের নীল জলরাশি থেকে জেলেরা যখন তাদের টানা জাল টেনে তুলছিলেন, তখন রোদে চকচক করে ওঠা রুপালি ছুরি মাছের স্তূপ দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায় উপস্থিত সবার।
২৫ জন মাঝিমাল্লার এক বিকেলের পরিশ্রমে রেকর্ড ১০৯ মণ ছুরি মাছ

মৌলভী হাফেজ আহমদের মালিকানাধীন নৌকায় ধরা পড়া এই বিশাল মৎস্যভাণ্ডার ৮ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কেবল অর্থনৈতিক সাফল্য নয়, এই মাছ ধরা পড়ার নেপথ্যে জড়িয়ে আছে এক মানবিক গল্পও। নৌকার মালিক হাফেজ আহমদ জানান, মাদরাসার জন্য গরু কেনার যে আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছিল, সাগরের এই দান যেন অলৌকিকভাবে সেই সমস্যার সমাধান করে দিল।

তবে এই আকস্মিক মাছের আধিক্য কি কেবলই ভাগ্য, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কোনো প্রাকৃতিক কারণ?

কেন হঠাৎ এত মাছ? বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

শীতকালীন এই মৌসুমে টেকনাফ উপকূলে এত বিপুল পরিমাণ ছুরি মাছ (Largehead Hairtail) ধরা পড়ার পেছনে সমুদ্রবিজ্ঞানী ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন:

আপওয়েলিং (Upwelling) বা পুষ্টির প্রবাহ: শীতকালে সমুদ্রের উপরিভাগের পানি ঠান্ডা হয়ে নিচে নেমে যায় এবং নিচের পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ঠান্ডা পানি উপরে উঠে আসে। এই প্রক্রিয়ায় ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও জুপ্ল্যাঙ্কটন বৃদ্ধি পায়, যা ছুরি মাছের মতো শিকারি মাছের প্রধান খাদ্য।

মাইগ্রেশন প্যাটার্ন: ছুরি মাছ সাধারণত দলবদ্ধভাবে বিচরণ করে (Schooling behavior)। প্রজনন বা খাদ্যের সন্ধানে তারা এই সময়ে গভীর সমুদ্র থেকে অগভীর উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে চলে আসে।

তাপমাত্রার ভারসাম্য: বঙ্গোপসাগরের এই অঞ্চলে পানির তাপমাত্রা এই সময়ে ছুরি মাছের জন্য আদর্শ অবস্থায় থাকে, যা তাদের দ্রুত চলাচলে ও জালে আটকা পড়তে সহায়ক হয়।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের অভিমত

এই মৎস্য প্রাচুর্য নিয়ে মতামত প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. রিচার্ড হ্যামিল্টন (Marine Biologist, FAO)। তিনি বলেন: “বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলটি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। টেকনাফ উপকূলে একসাথে এত বিপুল পরিমাণ ছুরি মাছ ধরা পড়া নির্দেশ করে যে, ওই নির্দিষ্ট এলাকায় বর্তমানে প্রচুর পরিমাণে ছোট মাছ ও ক্রাস্টাসিয়ান (কাঁকড়া বা চিংড়ি জাতীয় প্রাণী) রয়েছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, অতি-আহরণ (Overfishing) যেন দীর্ঘমেয়াদে এই বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি না করে। এই ধরণের ‘ফিশ স্কুলিং’ মূলত সামুদ্রিক স্রোত ও তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তনের ফলাফল।”

পরবর্তী গন্তব্য: শুঁটকি মহাল থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম

ব্যবসায়ী এখলাস মিয়া জানান, এই মাছগুলো এখন পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে শুঁটকিতে রূপান্তর করা হবে। উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ এই ছুরি মাছের শুঁটকি চট্টগ্রাম ও ঢাকার বাজারে ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন। স্থানীয় জেলেদের মতে, মৌসুমে এমন বড় সাফল্য তাদের দীর্ঘদিনের হতাশা কাটিয়ে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।