Home First Lead শহর থেকে শেকড়ের টানে: এক নগরপিতার মেঠোপথ যাত্রা

শহর থেকে শেকড়ের টানে: এক নগরপিতার মেঠোপথ যাত্রা

ছবি সংগৃহীত
কামরুল হাসান, সিলেট: রাজনীতি কি কেবলই গদি আর ক্ষমতার মসৃণ গালিচা? নাকি এর পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে ধুলোবালি, কাদা আর অনিশ্চয়তার নদী পার হওয়া? উত্তরটা বোধহয় লুকিয়ে আছে সিলেটের পাহাড়ঘেরা জনপদের সেই জীর্ণ বাঁশের সাঁকোটির ওপর, যেখানে টলমল পায়ে ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়ে চলেছেন এক জননেতা। তিনি আরিফুল হক চৌধুরী।
সংগৃহীত ছবি
একসময় নগরপিতার আসনে বসে যিনি তিলোত্তমা সিলেট গড়ার স্বপ্ন দেখাতেন, আজ তিনি ভোটের প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের দুয়ারে পৌঁছাতে তুচ্ছ করছেন জীবনের ঝুঁকিকেও।
জনতার দুয়ারে: যখন সাঁকোই হয় সেতু

সিলেট-৪ (গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ) আসনের দুর্গম জনপদগুলোতে প্রচারণার যে খণ্ডচিত্র আজ ভাইরাল, তা কেবল ভোটের কসরত নয়; বরং রাজনীতির এক শাশ্বত রূপ। ছবিতে দেখা যায়, স্যুট-বুট পরা পরিপাটি নগরজীবনের অভ্যস্ত মানুষটি অবলীলায় পার হচ্ছেন গ্রামবাংলার সেই নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। নিচে খরস্রোতা নদী বা কর্দমাক্ত খাল, আর ওপরে স্থির লক্ষ্য—জনগণ।

ভোটের জন্য এই ‘কসরত’ কেবল শারীরিক নয়, এটি মানসিকও। মানুষের মন জয়ের জন্য কখনো তাকে বসতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে মাটির ওপর, কখনো আবার মোনাজাতে হাত তুলে মিশে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে। এই জনপদে ভোট মানে কেবল ব্যালট নয়, ভোট মানে হচ্ছে জীর্ণ সাঁকোর ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া।

ছবি সংগৃহীত
আরিফুল হক চৌধুরী: রাজপথ থেকে নগরভবন

আরিফুল হক চৌধুরীর রাজনৈতিক উত্থান কোনো রূপকথা নয়। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নেতা রাজনীতির মাঠ চষে বেরিয়েছেন ছাত্রদলের সোনালী দিনগুলো থেকে।

নগরপিতা থেকে জননেতা: সিলেট সিটি কর্পোরেশনের টানা দুবারের মেয়র হিসেবে তিনি নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। নগরের উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন আর আধুনিকায়নে তার কারিশমা ছিল নজরকাড়া।

ত্যাগের রাজনীতি: ২০২৩ সালের সিটি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন দলের প্রতি তার আনুগত্য। বর্তমানে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

অতীতের সংগ্রাম ও বর্তমানের চ্যালেঞ্জ

তার রাজনৈতিক পথচলা কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কারাগারে কাটানো দীর্ঘ দিনগুলো তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য। আর বর্তমানের এই সাঁকো পার হওয়া প্রচারণা তাকে শেখাচ্ছে শেকড়ের টান। সিলেট-৪ আসনের সীমান্ত এলাকায় উন্নয়নের যে হাহাকার, তা ঘোচাতে তিনি এখন চষে বেড়াচ্ছেন গোয়াইনঘাট থেকে জৈন্তাপুরের প্রতিটি অলিগলি।

আপনি দুবারের সফল মেয়র ছিলেন। কখনও গাড়িতে, আবার কখনও জীর্ণ সাঁকোতে জীবন বাজি রেখে ভোট চাইতে হচ্ছে—কেমন লাগছে?   এই প্রশ্নের উত্তরে আরিফুল হক চৌধুরী বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধিকে বলেন, “দেখুন, রাজনীতি মানেই তো মানুষের কাছে পৌঁছানো। আমি যখন নগরভবনে ছিলাম, তখন হয়তো এসিতে বসে ফাইল সই করেছি, কিন্তু আমার মনটা পড়ে থাকত এই মেহনতি মানুষের জনপদে। আজ এই সাঁকো পার হওয়াটা আমার কাছে কোনো কসরত নয়, বরং আমার শেকড়ের কাছে ফিরে আসা। মানুষ যদি এই নড়বড়ে সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করতে পারে, তবে আমি তাদের প্রতিনিধি হতে চাইলে কেন পারব না?”

আরিফুল হক চৌধুরীর ভোট তৎপরতা প্রসঙ্গে গোয়াইনঘাটের কৃষক আবদুর রহিম বললেন,  “আগে কত নেতা আইলা আর গেলা, কিন্তু বড় মানুষ হইয়াও আরিফ সাব যেভাবে আমগর লগে মাটির উপরে বইসা কথা কইরা, হউটা দেইখা ভালো লাগছে। আমরা তো বড় অট্টালিকা চাই না, আমরা চাই এমন মানুষ যে আমগর কাদা-মাটির খবর রাখব।”

ভোটের ব্যাকরণ ও রাজনীতির কাব্য

একজন নেতার জনপ্রিয়তা কেবল জনসভায় দেওয়া তপ্ত বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ফুটে ওঠে যখন তিনি নিজের গাম্ভীর্য বিসর্জন দিয়ে সাধারণের সাথে একাত্ম হন। আরিফুল হক চৌধুরীর এই সাঁকো পার হওয়ার দৃশ্যটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক অনন্য রূপক। এটি প্রমাণ করে, ক্ষমতার শীর্ষ থেকে তৃণমূলের ধুলোমাটি পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে একজন নেতাকে কতটা পরিশ্রমী আর সংকল্পবদ্ধ হতে হয়।

ভোটের এই বৈতরণী পার হতে তিনি সফল হবেন কি না, তা মহাকাল বলবে। তবে জীর্ণ সাঁকোর ওপর তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ এই বার্তাই দেয়—রাজনীতি হলো মানুষের কাছে পৌঁছানোর এক অবিরাম যাত্রা, যেখানে পথ মসৃণ না হলেও গন্তব্য সবসময়ই জনগণ।