Home আন্তর্জাতিক বিশ্বজুড়ে ভয়ংকর আকার নিচ্ছে বন্যপ্রাণি পাচার

বিশ্বজুড়ে ভয়ংকর আকার নিচ্ছে বন্যপ্রাণি পাচার

৭ থেকে ২৩ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ বাণিজ্য
তারিক-উল- ইসলাম, ঢাকা: পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের জন্য নীরব কিন্তু ভয়ংকর এক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণি পাচার। মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচারের পর এটি বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অবৈধ বাণিজ্য হিসেবে বিবেচিত। ইন্টারপোল ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭ থেকে ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বন্যপ্রাণি ও তাদের দেহাংশ অবৈধভাবে কেনাবেচা হচ্ছে, যা প্রকৃতি ও মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবৈধ বাণিজ্যের ফলে বিশ্বের প্রায় সাত হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণি সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পাচার হওয়া প্রাণিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে প্যাঙ্গোলিন বা বনরুই, বাঘ, হাতি, গণ্ডার, কচ্ছপ, বিভিন্ন বিরল পাখি যেমন ধনেশ ও টিয়া, তক্ষক এবং লজ্জাবতী বানরের।
একই সঙ্গে হাতির দাঁত, গণ্ডারের শিং, বাঘের হাড় ও চামড়া, প্যাঙ্গোলিনের আঁশ এবং হাঙ্গরের পাখনা আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। উদ্ভিদের মধ্যে চন্দন কাঠ, দুর্লভ অর্কিড ও নানা ওষুধি গাছ ব্যাপকভাবে পাচার হচ্ছে।
বন্যপ্রাণি পাচারের পেছনে রয়েছে একাধিক বৈশ্বিক কারণ। চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশে ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় বাঘের হাড় বা গণ্ডারের শিংকে অলৌকিক রোগ নিরাময়ের উপাদান হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। আবার হাতির দাঁতের গয়না বা বাঘের চামড়া অনেকের কাছে আভিজাত্য ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক।
শৌখিন পোষা প্রাণীর বাজারেও বিরল প্রজাতির পাখি, বানর ও সরীসৃপের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি বন্য প্রাণির মাংস বা হাঙ্গরের পাখনা অনেক দেশে দামী ও বিলাসী খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এই পাচার কার্যক্রম পরিচালিত হয় অত্যন্ত সংগঠিত ও কৌশলী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। দুর্গম বনাঞ্চল থেকে শুরু করে স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথ ব্যবহার করে পাচারকারীরা প্রাণি ও দেহাংশ সরিয়ে নেয়। এমনকি ডার্ক ওয়েবসহ অনলাইন প্ল্যাটফর্মও এখন পাচারের নতুন মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
অনেক সময় গৃহপালিত প্রাণি বা আসবাবপত্রের আড়ালে বন্যপ্রাণি লুকিয়ে সীমান্ত পার করা হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় বন্যপ্রাণি পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এর পরিণতি ভয়াবহ। বন্যপ্রাণি পাচারের কারণে প্যাঙ্গোলিন ও মালয়ান টাইগারের মতো প্রজাতি এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। একই সঙ্গে কোভিড-১৯ বা ইবোলার মতো জোনোটিক রোগ বন্যপ্রাণির অবৈধ কেনাবেচার মাধ্যমেই মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। কোনো একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হলে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে, সৃষ্টি হয় মারাত্মক বাস্তুসংস্থান ভারসাম্যহীনতা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কয়েকটি বড় ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ২০২৫ সালে মাদাগাস্কারে ৮০০টি রেডিয়েটেড কচ্ছপ পাচারের সময় একটি আন্তর্জাতিক চক্রকে আটক করা হয়, যারা তানজানিয়া হয়ে এশিয়ায় কচ্ছপগুলো পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিল।
২০২৪ সালে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একাধিক অভিযানে বিরল প্রজাতির তোতা ও বনরুই উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ইন্টারপোলের উদ্যোগে পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডার’-এ বাংলাদেশ পুলিশ একাধিক আন্তর্জাতিক পাচার চক্র শনাক্ত ও দমন করতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী বন্যপ্রাণি শিকার ও পাচার শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বর্তমানে সংশোধিত ও আধুনিকায়িত এই আইনের আওতায় বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং বন বিভাগের ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিট নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা অর্জন করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতাও বন্যপ্রাণি অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কোনো এলাকায় অবৈধ কেনাবেচা বা পাচারের তথ্য পেলে দ্রুত প্রশাসনকে জানাতে সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যপ্রাণি রক্ষা মানে শুধু প্রাণিকে বাঁচানো নয়। এটি প্রকৃতি, পরিবেশ এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজের অস্তিত্ব রক্ষার এক অপরিহার্য লড়াই।