বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, সিলেট: সিলেটে ভূমিকম্প যেন এখন নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ও মাসের ব্যবধানে একের পর এক মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে জনমনে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে আজকের কম্পনটি ছাতক ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বেশ অনুভূত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘনঘন কম্পনের পেছনে সুনির্দিষ্ট ভূতাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।
কেন বারবার কাঁপছে সিলেট?
ভূতাত্ত্বিক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটে ঘনঘন ভূমিকম্প হওয়ার প্রধান তিনটি কারণ রয়েছে:
১. তিন প্লেটের মিলনস্থল: বাংলাদেশ মূলত তিনটি টেকটোনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেট) সংযোগস্থলে অবস্থিত। এর মধ্যে সিলেট অঞ্চলটি এই প্লেটগুলোর খুবই কাছাকাছি হওয়ায় এটি অত্যন্ত সক্রিয় এবং সংবেদনশীল।
২. ডাউকি ফল্টের সক্রিয়তা: সিলেটের উত্তর সীমান্ত ঘেঁষেই রয়েছে ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ডাউকি ফল্ট’ (Dauki Fault)। ঐতিহাসিক রেকর্ড অনুযায়ী, এই ফল্টটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্প তৈরি করতে সক্ষম। বর্তমানে এই ফল্টে সঞ্চিত শক্তি ছোট ছোট কম্পনের মাধ্যমে নির্গত হচ্ছে, যা বারবার ভূমিকম্পের কারণ।
৩. একাধিক চ্যুতির অবস্থান: ডাউকি ফল্ট ছাড়াও শাহবাজপুর ফল্ট এবং পার্শ্ববর্তী ভারতের আসামের ‘কপিলি ফল্ট’ সিলেটের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। সম্প্রতি ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে হওয়া কম্পনগুলোর প্রভাব সরাসরি সিলেটে অনুভূত হচ্ছে।
বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট ছোট এই কম্পনগুলো দুই ধরনের সংকেত দেয়। প্রথমত, এগুলো বড় কোনো ভূমিকম্পের আগে ‘ফোরশক’ (Foreshock) বা প্রাথমিক কম্পন হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটি সঞ্চিত শক্তি ধীরে ধীরে নির্গত হওয়ার প্রক্রিয়াও হতে পারে। তবে ডাউকি ফল্টে গত ১০০ বছরে বড় কোনো ভূমিকম্প না হওয়ায় সেখানে প্রচুর শক্তি জমা হয়ে আছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে।
ঝুঁকি ও করণীয়
সিলেট শহরটি মূলত নরম মাটির ওপর অবস্থিত এবং এখানে অনেক পুরনো ও অপরিকল্পিত বহুতল ভবন রয়েছে। ৭ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হলে শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সতর্কতা হিসেবে যা করা জরুরি:
নতুন ভবন নির্মাণে ‘ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ কঠোরভাবে মেনে চলা।
পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার বা মজবুত করা।
ভূমিকম্পের সময় খোলা জায়গায় আশ্রয় নেওয়া এবং আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা।
সিলেটের বারবার এই কম্পন আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রকৃতির এই সতর্কবার্তাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। অবকাঠামোগত প্রস্তুতিই পারে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে।
নিয়মিত আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মন্তব্য জানান।