দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যে নামটি ছিল পশ্চিমাবিরোধী শিবিরের সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ, সেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেয়ির প্রয়াণে এক বিশাল যুগের অবসান ঘটল। সমর্থকদের কাছে তিনি কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন আধুনিক বিশ্বের ‘ইমপেরিয়ালিজম’ বা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ইসলামি প্রতিরোধের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
খামেনেয়ির শাসনামলের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয় তাঁর রণকৌশলগত দক্ষতাকে। তিনি আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক আধিপত্যের সামনে এক দুর্ভেদ্য চ্যালেঞ্জ তুলে দিয়েছিলেন।
তাঁর সমর্থকদের মতে, এটি ছিল মুসলিম বিশ্বের ওপর পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে এক সফল রুখে দাঁড়ানো।
পশ্চিমারা যখন ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করতে একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, খামেনেয়ি তখন ডাক দিয়েছিলেন ‘প্রতিরোধী অর্থনীতি’ গড়ার। তাঁর নেতৃত্বেই ইরান অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে সামরিক সরঞ্জাম এবং মহাকাশ গবেষণায় ইরানের অগ্রগতি বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে, যা তাঁর আমলেই বেগবান হয়।
২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা সরে আসা এবং জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পরও খামেনেয়ি মাথানত করেননি। বরং তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন যে, কোনো চাপের মুখেই ইরান তার আদর্শিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হবে না।
তাঁর এই আপসহীন মনোভাবই তাকে মুসলিম বিশ্বের একাংশের কাছে ‘মহানায়ক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
গতকালকের সেই ভয়াবহ হামলার পর আজ যখন পুরো ইরান শোকাতুর, তখন তাঁর অনুসারীদের মনে একটিই প্রশ্ন—কে নেবেন এই প্রতিরোধের ঝাণ্ডা? তবে খামেনেয়ি যে আদর্শিক ভিত্তি রেখে গেছেন, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। পশ্চিমাবিরোধী এই লড়াইয়ের ইতিহাসে তাঁর নাম এক বিশেষ মর্যাদায় সিক্ত থাকবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ি কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি আদর্শ। যে আদর্শ পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের দেশ ও ধর্মকে রক্ষা করতে শিখিয়েছিল।
তাঁর মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ বদলে যেতে পারে, কিন্তু তাঁর তৈরি করা ‘প্রতিরোধের পথ’ পশ্চিমা শক্তির জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।