বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, কুমিল্লা: ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। কুয়াশার পাতলা চাদরে ঢাকা কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং। চারদিকে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রকৃতির স্তব্ধতা ভেঙে ধেয়ে আসছিল লোহার দানব—চট্টগ্রাম মেইল। কেউ জানত না, সেই ইঞ্জিনের গর্জন আজ ১২টি পরিবারের কান্নার রোল হয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপাবে।
একটি বাস, কতগুলো প্রাণ আর একরাশ স্বপ্ন—সব নিমিষেই পিষ্ট হয়ে গেল রেলের চাকায়। চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী ‘মামুন স্পেশাল’ বাসটি যখন রেললাইনে উঠে পড়ে, তখন রোববার (২২ মার্চ) ভোররাত ৩টা। কুমিল্লার সদর উপজেলার জাঙ্গালিয়া কচুয়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। হয়তো যাত্রীরা ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। কেউ হয়তো ভাবছিলেন গন্তব্যে পৌঁছে প্রিয়জনের মুখ দেখবেন। কিন্তু ঘাতক ট্রেনের ধাক্কায় বাসটি প্রায় এক কিলোমিটার ছেঁচড়ে নিয়ে গেল যমদূত হয়ে। লোহার ঘর্ষণে ছিটকে আসা আগুনের স্ফুলিঙ্গ আর যাত্রীদের আর্তনাদে মুহূর্তেই নরককুণ্ডে পরিণত হলো শান্ত সেই জনপদ।
কান্নার রোল আর প্রিয়জন হারানোর হাহাকার
সকালে দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় এক বিভীষিকাময় চিত্র। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জুতো, বাচ্চাদের খেলনা আর রক্তমাখা জামাকাপড়। রেললাইনের ওপর চাপচাপ রক্ত যেন এক একটি অসমাপ্ত গল্পের সাক্ষী।
সেখানেই দেখা হলো ষাটোর্ধ্ব রহিমা বিবির সাথে। তিনি তার একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছেন এই দুর্ঘটনায়। শূন্য দৃষ্টিতে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে তিনি বিলাপ করছিলেন: “বাবা রে, তুই তো কইছিলি ইফতারের আগে বাড়ি ফিরবি। এখন আমি কারে নিয়া ইফতার করুম? ও আল্লা, আমারে কেন নিলি না, আমার পোলাডারে কেন কাইড়া নিলি?”
সাক্ষাৎকার: প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকর্মী
দুর্ঘটনার সময় ঠিক পাশেই ছিলেন স্থানীয় চা দোকানি আব্দুল জলিল। আতঙ্কে তার কণ্ঠ তখনও কাঁপছে। তিনি বলেন: “চোখের সামনে সব শেষ হইয়া গেল। গেটম্যান আছিল না, সিগন্যালও পড়ে নাই। বাসটা যখন লাইনে উঠল, তখনই ট্রেনটা আইসা সজোরে ধাক্কা দিল। মানুষের চিল্লাইনি আর হাড় ভাঙার শব্দ আমি কোনোদিন ভুলতে পারুম না। মনে হইতাছিল কিয়ামত নাইমা আইছে।”
উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন: “আমরা যখন বাসের ভেতর থেইকা লাশগুলা বের করতেছিলাম, তখন হাত-পা কাইপা উঠতাছিল। একটা ছোট্ট শিশু তার মায়ের আঁচল শক্ত করে ধইরা আছিল। মৃত্যুও তাদের আলাদা করতে পারে নাই। এমন দৃশ্য সহ্য করা কঠিন।”
দায় কার?
ঘটনার পর পর রেল কর্তৃপক্ষ দু’জন গেটম্যানকে বরখাস্ত করলেও তাতে কি ১২টি প্রাণের দাম মেটানো সম্ভব? স্থানীয়দের অভিযোগ, সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটি আর দায়িত্বে অবহেলাই এই ‘হত্যাকাণ্ডের’ মূল কারণ। তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, হয়তো রিপোর্ট আসবে, কিন্তু যে মায়েরা তাদের সন্তান হারালেন, তাদের শূন্য বুক কি আর কোনোদিন পূর্ণ হবে?
আজকের এই রক্তস্নাত ভোর আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে গেল—এক মুহূর্তের অসতর্কতা বা অবহেলা কতগুলো সাজানো সংসারকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিতে পারে। পদুয়ার বাজারের এই রেললাইন এখন আর কেবল যাতায়াতের পথ নয়, এটি এখন ১২টি তাজা প্রাণের সমাধিস্থল।