সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাতে বড় ডিগ্রি লাগে না, লাগে অদম্য ইচ্ছা আর সততা—এই ধ্রুব সত্যের জীবন্ত উদাহরণ আল রাজি পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা শেখ সালেহ আবদুল আজিজ আল রাজি এবং তার ভাই সুলাইমান আল রাজি। আজ বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে ‘আল রাজি ব্যাংক’ একটি অতি পরিচিত নাম। কিন্তু এই বিশাল সাম্রাজ্যের শুরুটা হয়েছিল রিয়াদের ধুলোমাখা বাজারের এক কুলির সামান্য শ্রম থেকে।
শৈশবে এক রিয়ালের কান্না
গল্পটা শুরু হয় গত শতাব্দীর ৩০-এর দশকে। সৌদি আরবের কাসিম প্রদেশের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া সালেহ আল রাজি ও সুলাইমান আল রাজিরা তখন তীব্র অভাবের মুখে। পরিবারের সামর্থ্য ছিল না সুলাইমানকে পড়াশোনা করানোর। মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি স্কুলের পাঠ চুকিয়ে পেটের তাগিদে কাজ শুরু করেন।
একবার স্কুলে শিক্ষা সফরে যাওয়ার জন্য মাত্র এক রিয়ালের প্রয়োজন ছিল সুলাইমানের। কিন্তু সেই এক রিয়াল দেওয়ার মতো সামর্থ্য তার বাবার ছিল না। পরদিন ফিলিস্তিনি শিক্ষক ক্লাসে একটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে তাকে এক রিয়াল উপহার দেন। সেই সামান্য এক রিয়ালই ছিল তার জীবনের প্রথম বড় ‘উপার্জন’, যা তাকে অভাবের মাঝেও স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল।
কুলিগিরি থেকে মুদ্রা বিনিময়
পরিবারের বড় সন্তান সালেহ আল রাজি রিয়াদের স্থানীয় বাজারে কুলি হিসেবে কাজ শুরু করেন। মানুষের ভারী বোঝা পিঠে বয়ে বেড়ানোর সেই দিনগুলোতে তিনি জানতেন না, একদিন তিনি হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করবেন। শ্রম দিয়ে জমানো সামান্য অর্থ দিয়ে তিনি প্রথমে পুরোনো লোহার (স্ক্র্যাপ) ব্যবসা শুরু করেন।
১৯৩৭ সালে রিয়াদের প্রধান মসজিদের সামনে ছোট একটি জায়গায় মুদ্রা বিনিময়ের দোকান দেন তিনি। তখনকার দিনে হজ করতে আসা তীর্থযাত্রীরা উটের কাফেলায় আসতেন। সালেহ ও তার ভাই সুলাইমান মরুভূমির উত্তপ্ত বালু পেরিয়ে মক্কা-মদিনার হাজিদের সেবা দিতেন এবং মুদ্রা বিনিময় করতেন। সুলাইমান তখন বড় ভাইয়ের দোকানে মাত্র ১০ ডলার বেতনে রান্নাবান্না এবং টুকটাক কাজ করতেন।
বড় স্বপ্ন এবং ইসলামিক ব্যাংকিং
১৯৫৭ সালে চার ভাই—সালেহ, সুলাইমান, মোহাম্মদ ও আবদুল্লাহ মিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসায় হাত দেন। ৭০-এর দশকে যখন সৌদি আরবে তেলের জোয়ার এল, তখন প্রবাসী শ্রমিকদের টাকা বাড়ি পাঠানোর প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠল আল রাজি এক্সচেঞ্জ। কিন্তু তারা শুধু টাকার পেছনে ছোটেননি।
১৯৮৩ সালে তারা বিশ্বের প্রথম বড় পরিসরের সুদহীন ‘ইসলামিক ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার অনুমতি পান। ব্রিটিশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের তারা বুঝিয়েছিলেন যে, সুদ ছাড়াও ব্যাংকিং লাভজনক হতে পারে।
বিশাল সাম্রাজ্য ও দানবীর
আজ আল রাজি ব্যাংক কেবল সৌদি আরবে নয়, কুয়েত, জর্ডান এবং মালয়েশিয়াতেও দাপটের সাথে ব্যবসা করছে। শুধু ব্যাংক নয়, বিশ্বের বৃহত্তম খেজুর বাগানটিও আল রাজি পরিবারের। কাসিম প্রদেশে অবস্থিত ৫ হাজার হেক্টরের এই বাগানে প্রায় ২ লাখ গাছ রয়েছে, যা থেকে উপার্জিত অর্থ এবং খেজুর প্রতি বছর পবিত্র রমজানে মক্কা-মদিনার রোজাদারদের জন্য ব্যয় করা হয়।
রিক্ত হাতে বিদায়
সাফল্যের চরম শিখরে থাকা অবস্থায় সুলাইমান আল রাজি এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। তিনি তার জীবদ্দশাতেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ সন্তান এবং জনকল্যাণমূলক ট্রাস্টে ভাগ করে দিয়ে নিজেকে ‘নিঃস্ব’ ঘোষণা করেন। তিনি বলেছিলেন, “আমি গরিব হিসেবে জন্মেছিলাম, আল্লাহর আমানত তার বান্দাদের দিয়ে আমি আবার শূন্য হাতে ফিরতে চাই।”
বাজারের সেই কুলি বা সাধারণ দোকান কর্মচারীর হাত ধরে আজ আল রাজি পরিবার বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী কর্পোরেট শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাদের এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিশ্রম আর নিষ্ঠা থাকলে ভাগ্যের চাকা একদিন ঘুরবেই।