Home অন্যান্য সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ : স্থাপত্যের বিস্ময় ও এক পবিত্র জুমার স্মৃতি

সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ : স্থাপত্যের বিস্ময় ও এক পবিত্র জুমার স্মৃতি

সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ
পর্ব ৩:

ওমান স্মৃতির দুই দশক: স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে দেখা

কামরুল ইসলাম

২০০৬ সালের সেই সফরের দ্বিতীয় দিনটি ছিল শুক্রবার। আরব দেশগুলোতে জুমার দিন মানেই এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ। আমাদের জন্য দিনটি ছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়, কারণ সেদিন আমাদের নামাজ পড়ার কথা ছিল ওমানের স্থাপত্যের মুকুট হিসেবে পরিচিত ‘সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ’ (Sultan Qaboos Grand Mosque)-এ। মাস্কাটের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই বিশাল মসজিদটি কেবল ইবাদতের স্থান নয়, এটি আধুনিক ইসলামিক স্থাপত্যের এক জীবন্ত জাদুঘর।
মসজিদের প্রবেশমুখে সেই পরিচিতি পুস্তিকা
নামাজের বেশ আগেভাগেই আমরা সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলাম। মসজিদ প্রাঙ্গণে পা রাখতেই এক স্নিগ্ধ আভিজাত্য আমাদের ঘিরে ধরল। ভেতরে প্রবেশের সময় আমাদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল চমৎকারভাবে ছাপানো একটি পরিচিতি পুস্তিকা বা ব্রোশিওর। সেখানে আরবি, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় মসজিদের নির্মাণশৈলী, ইতিহাস এবং এর অভ্যন্তরের বিস্ময়কর তথ্যগুলো সাজানো ছিল। সাংবাদিক হিসেবে সেই পুস্তিকাটি আমাদের জন্য ছিল এক বিরাট তথ্যভাণ্ডার, যা মসজিদের প্রতিটি কোণ বুঝতে আমাদের সাহায্য করেছিল।
ছবি সংগৃহীত
শ্বেত পাথরের শুভ্রতা ও জৌলুস
পুরো মসজিদটি তৈরি করা হয়েছে মূল্যবান ভারতীয় বেলেপাথর আর ইতালীয় মার্বেল দিয়ে। রোদের আলোয় মসজিদের শুভ্রতা যেন চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল। সুবিশাল পাঁচটি মিনার (যা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের প্রতীক) আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মসজিদের চারপাশের বাগান আর ফোয়ারাগুলো মরুভূমির তপ্ত আবহাওয়ায় এক শীতল প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছিল। আমরা যখন অজু সেরে মূল প্রার্থনা কক্ষের দিকে এগোচ্ছিলাম, তখন এক ধরনের আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য আমাদের গ্রাস করছিল।
বিশ্বের অন্যতম বিশাল ঝাড়বাতি ও কার্পেট
মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতেই আমাদের চোখ ছানাবড়া! মাথার ওপরে ঝুলে আছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং জমকালো স্ফটিক বা ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি। জার্মানির তৈরি এই ঝাড়বাতিতে কয়েক হাজার স্বরোভস্কি ক্রিস্টাল বসানো, যা থেকে বিচ্ছুরিত আলো পুরো হলরুমকে অপার্থিব রূপ দিচ্ছিল। আর পায়ের নিচে ছিল একখণ্ড বিশাল হাতে বোনা ইরানি কার্পেট।
ব্রোশিওর থেকে জানলাম, কয়েকশ দক্ষ কারিগর কয়েক বছর ধরে বিরতিহীনভাবে এই কার্পেটটি বুনেছেন। সে সময় এটিই ছিল বিশ্বের বৃহত্তম একখণ্ড কার্পেট।
জুমার নামাজ ও এক অনন্য অনুভূতি
খুতবা শুরু হওয়ার আগেই বিশাল হলরুমটি মুসল্লিদের উপস্থিতিতে ভরে উঠল। ওমানিদের ঐতিহ্যবাহী সাদা পোশাক ‘দিশদাশা’ আর রঙিন পাগড়ির ভিড়ে আমরা বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে এক কাতারে দাঁড়ালাম। জুমার খুতবা আর নামাজের সেই শান্ত পরিবেশ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল— সীমানা ভিন্ন হলেও বিশ্বাসের সুতোয় আমরা সবাই এক। মসজিদের সেই বিশাল গম্বুজের নিচে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করার সময় অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করছিলাম।
বিদায় বেলা ও আতিথেয়তা
নামাজ শেষে আমরা যখন বাইরে এলাম, তখন মসজিদের বিশাল চত্বরে রোদের তীব্রতা বেড়েছে। কিন্তু মসজিদের ভেতরের সেই শীতলতা আর আধ্যাত্মিক আবহ আমাদের মনে সতেজতা ধরে রেখেছিল। দূতাবাসের কর্মকর্তারা আমাদের জন্য বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। সেই পবিত্র জুমার স্মৃতি নিয়ে আমরা যখন হোটেলের দিকে ফিরছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল ওমান কেবল তেলের খনি বা পাহাড়ের দেশ নয়, এটি উন্নত রুচি আর গভীর ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক মিলনস্থল।

পরবর্তী পর্বে থাকছে: মাস্কাট থেকে সালালাহ অভিমুখে সেই রোমাঞ্চকর বাস যাত্রা এবং প্রবাসীদের আশ্রয়স্থল মফিজুর রহমানের সেই বিশাল বাসভবন।