রাস্তায় ‘স্মার্টফোন জম্বি’: অসচেতনতায় বাড়ছে প্রাণহানি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি
ফরিদুল আলম, ঢাকা: রাজধানীর ব্যস্ততম কারওয়ান বাজার মোড়ে সিগন্যাল ছাড়াই রাস্তা পার হচ্ছিলেন এক তরুণ। কানে হেডফোন, চোখ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। দ্রুতগতিতে আসা একটি বাস ব্রেক কষায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেলেন তিনি। তবে চালকের চিৎকার বা আশপাশের মানুষের সতর্কবাণী—কোনোটিই যেন তার কানে পৌঁছাল না। এই দৃশ্য এখন ঢাকার প্রতিটি মোড়ে নিত্যনৈমিত্তিক।
বিশ্বজুড়ে এই ধরনের পথচারীদের বলা হচ্ছে ‘স্মার্টফোন জম্বি’। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল ফোনে নিমগ্ন থেকে পথ চলা এখন সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণার ভয়াবহ তথ্য
২০২৪ সালে চীনের দক্ষিণ-পূর্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফোনে কথা বলা বা স্ক্রিন দেখার সময় পথচারীদের চারপাশের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা প্রায় ৮০ শতাংশ লোপ পায় ।
২০২০ সালে বেলজিয়ামের এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা সাধারণের তুলনায় অনেক ধীরগতিতে হাঁটেন এবং তাদের হাঁটার পথ আঁকাবাঁকা হয়, যা যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে।
অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, প্রতি পাঁচজন পথচারীর মধ্যে একজন রাস্তা পার হওয়ার সময় ফোন ব্যবহার করেন। এদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই কোনো না কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির শিকার হন। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হচ্ছে ‘ইনঅ্যাটেনশনাল ব্লাইন্ডনেস’ বা ‘অমনোযোগী অন্ধত্ব’।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও আইনি ঝুঁকি
বাংলাদেশেও এই প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রাস্তা পার হওয়ার সময় টেক্সট করা, সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা বা গান শোনার প্রবণতা বেশি।
বিশেষজ্ঞ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিমত:
- ট্রাফিক পুলিশের সতর্কতা: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, চালকদের পাশাপাশি পথচারীদের অসচেতনতাও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। অনেক সময় কানে হেডফোন থাকায় পথচারীরা গাড়ির হর্ন শুনতে পান না।
- ছিনতাইয়ের ঝুঁকি: মোবাইল ফোনে মগ্ন পথচারীরা কেবল দুর্ঘটনারই শিকার হন না, বরং তারা ছিনতাইকারী ও ‘টানা পার্টি’র সহজ লক্ষ্যে পরিণত হন।
- আইনি ব্যবস্থা: প্রচলিত সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, যত্রতত্র রাস্তা পারাপার (জে-ওয়াকিং) বা ঝুঁকি নিয়ে পথ চলা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বেপরোয়া আচরণের মাধ্যমে অন্যের জীবন বিপন্ন করলে জেল ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই বিচ্যুতি সারাজীবনের কান্না হয়ে দাঁড়াতে পারে। নিরাপদ থাকতে তারা নিচের পরামর্শগুলো মেনে চলার তাগিদ দিয়েছেন:
“সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো রাস্তা পার হওয়ার সময় ফোন পকেটে বা ব্যাগে রাখা। যদি খুব জরুরি ফোন আসে, তবে ফুটপাতের একপাশে দাঁড়িয়ে কথা শেষ করে তারপর সচেতনভাবে রাস্তা পার হওয়া উচিত।”










