গবাদিপশু প্রজনন ও বৈশ্বিক ডেইরি বা ক্যাটেল ফার্মিংয়ের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করেছে ব্রাজিলের একটি গরু। তুষার-সাদা রঙের এই সুপারকাউটির নাম ‘ভিয়াতিনা-১৯’ (Viatina-19 FIV Mara Imóveis)। ব্রাজিলের সাও পাওলোর আরান্দু শহরে অনুষ্ঠিত একটি মর্যাদাপূর্ণ নিলামে গরুটির এক-তৃতীয়াংশ (৩৩.৩%) মালিকানা রেকর্ড ১৪ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে। সেই সূত্রে পুরো গরুটির মোট বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ৪৩ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৯ কোটি টাকার সমান। এই আকাশচুম্বী দামের কারণে ভিয়াতিনা-১৯ বিশ্বের সবচেয়ে দামি গরু হিসেবে ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ নাম লিখিয়েছে।
১,১০১ কেজির দানবীয় শরীর ও বাহ্যিক সৌন্দর্য
ভিয়াতিনা-১৯ সাধারণ কোনো গরু নয়। ৫৩ মাস বয়সী এই গরুটির ওজন ১,১০১ কেজি (প্রায় ২,৪২০ পাউন্ড), যা তার জাতের একটি সাধারণ পূর্ণবয়স্ক গরুর গড় ওজনের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এর চমৎকার শারীরিক গঠন, নিখুঁত খুর, পিঠের ওপর চর্বিহীন পেশির দ্রুত বৃদ্ধি এবং শান্ত স্বভাব একে অনন্য করে তুলেছে। গবাদিপশুদের ‘মিস ইউনিভার্স’ খ্যাত টেক্সাসের ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রতিযোগিতায় এটি ইতোমধ্যে ‘মিস সাউথ আমেরিকা’ খেতাব জয় করেছে।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত ‘নেল্লোর’ জাতের গৌরব
ভিয়াতিনা-১৯ মূলত ‘নেল্লোর’ (Nelore) জাতের গরু। এই জাতটির শিকড় রয়েছে ভারতে। ১৮০০-এর দশকে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের ওঙ্গোল (Ongole) জাতের এই গবাদিপশু ব্রাজিলে রপ্তানি করা হয়েছিল। ব্রাজিলের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই জাতটি দারুণভাবে খাপ খাইয়ে নেয় এবং বর্তমানে ব্রাজিলের মোট গরুর প্রায় ৮০ শতাংশই নেল্লোর জাতের। এদের উজ্জ্বল সাদা চামড়া এবং কাঁধের ওপর থাকা কুঁজ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ঢিলেঢালা চামড়া এবং বিশেষ সোয়েট গ্ল্যান্ডের কারণে এরা প্রচণ্ড তৈরি তাপমাত্রাও সহজে সহ্য করতে পারে। এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্য যেকোনো জাতের চেয়ে অনেক বেশি।
কেন একটি গরুর দাম ৫৯ কোটি টাকা?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, একটি গরুর দাম কীভাবে এত টাকা হয়? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই মূল্যের মূল কারণ হলো গরুটির ‘অসাধারণ জিনগত বৈশিষ্ট্য’ (Elite Genetics) এবং উচ্চ প্রজনন ক্ষমতা। ভিয়াতিনা-১৯ কে মূলত মাংস উৎপাদনের বৈশ্বিক মানদণ্ড উন্নত করার একটি ‘ফ্যাক্টরি’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ডিম্বাণু ও ভ্রূণ রপ্তানি: বিশ্বের বড় বড় খামারি ও প্রজননবিদরা তাদের খামারের গরুর মান উন্নত করতে ভিয়াতিনা-১৯-এর ডিম্বাণু (Egg Cells) সংগ্রহ করার জন্য মুখিয়ে থাকেন। এর মাত্র একটি ডিম্বাণু সংগ্রহের জন্য খামারিরা প্রায় আড়াই লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ কোটি টাকা) পর্যন্ত খরচ করেন।
বংশধরের গ্যারান্টি: ভিয়াতিনা-১৯ তার চমৎকার জিনগত বৈশিষ্ট্য ও দ্রুত মাংস বৃদ্ধির গুণাবলি তার পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে নিখুঁতভাবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম, যা ল্যাবে ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) প্রযুক্তির মাধ্যমে করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মাংসের বাজারে প্রভাব
ব্রাজিল বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গরুর মাংস রপ্তানিকারক দেশ। ভিয়াতিনা-১৯-এর এই রেকর্ড বিক্রয় কেবল একটি লেনদেন নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ক্যাটেল ইন্ডাস্ট্রিতে উন্নত বায়োটেকনোলজি এবং জিনোম সিলেকশনের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে প্রমাণ করে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তিনটি ডেইরি ও এগ্রো কোম্পানি—কাসা ব্রাঙ্কা এগ্রোপাস্তোরিল, এগ্রোপেকুয়ারিয়া নাপেমো এবং নেল্লোর এইচআরও যৌথভাবে এখন এই সুপারকাউটির মালিক। এর মাধ্যমে উৎপাদিত উন্নত জাতের গরু আগামী দিনে বিশ্বজুড়ে কম খরচে এবং কম সময়ে পুষ্টিকর ও চর্বিহীন মাংসের জোগান দিতে বড় ভূমিকা রাখবে।