Home Third Lead কলকাতার কলমে কর্ণফুলীর কহন

কলকাতার কলমে কর্ণফুলীর কহন

পশিমী পবনের চাটগাঁইয়া টান

  • বিভূতিভূষণ থেকে শুরু করে অদ্বৈত মল্লবর্মণ—কলকাতার দিকপাল সাহিত্যিকদের লেখায় চাটগাঁইয়া আঞ্চলিকতার বিশেষ প্রয়োগ।
  • লোকজ সংস্কৃতির উপাদান হিসেবে ‘বলি খেলা’ এবং ‘মেজবানি’ ঐতিহ্যের সাহিত্যিক প্রতিফলন।
  • চাটগাঁইয়া উপভাষার মিষ্টতা ও গাম্ভীর্যকে কলকাতার উপন্যাসে ফুটিয়ে তোলার শৈল্পিক কারিগরি।
  • গঙ্গা ও কর্ণফুলীর এই সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন যা দুই বাংলার সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়।
কৃষ্ণা বসু, কলকাতা: বাঙালি সংস্কৃতির দুই আদিম ধারা কলকাতা ও চট্টগ্রাম। একটি যদি হয় গঙ্গার পলিমাখা শান্ত স্নিগ্ধতা, তবে অন্যটি অবশ্যই কর্ণফুলীর উত্তাল লোনা হাওয়া। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে কলকাতার বিদগ্ধ সাহিত্যিকদের কলম বারবার মুগ্ধ হয়েছে চট্টগ্রামের সেই অমোঘ টানে। কেবল ভৌগোলিক বর্ণনা নয়, চট্টগ্রামের মেঠো উপভাষা আর লৌকিক আচারের ঘ্রাণ কলকাতার কালজয়ী সাহিত্যিকদের রচনায় এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ হোক বা অন্যান্য সমকালীন সাহিত্য—চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড় আর সমুদ্রের নীলিমা বারবার উঠে এসেছে বর্ণনার জাদুতে। তবে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি কলকাতার লেখকদের আকর্ষণ করেছে, তা হলো চট্টগ্রামের মানুষের মুখের ভাষা। সেই ‘হ’ আর ‘চ’-এর অদ্ভুত খেলা, যা কানে শুনলে মনে হয় কোনো আদিম সুর বাজছে।
সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো পন্ডিত সাহিত্যিক, যিনি কলকাতার সাহিত্যাকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন, তাঁর লেখায় চট্টগ্রামের এই আঞ্চলিক রস ও লোকজ আচারের নিপুণ প্রয়োগ পাঠকদের মোহিত করেছে।
চট্টগ্রামের লোকজ সংস্কৃতি, বিশেষ করে ‘বলি খেলা’ বা ‘জব্বার মিয়ার বলি খেলা’-র মতো বীরত্বগাথা কলকাতার বহু ছোটগল্প ও উপন্যাসে বীর রসের সঞ্চার করেছে। শুধু তাই নয়, সামুদ্রিক মাঝিদের শোনানো ‘সারি গান’ আর ‘ভাটিয়ালি’র চাটগাঁইয়া সংস্করণ কলকাতার লৌকিক সাহিত্যের উপাদান হিসেবে আদৃত হয়েছে।
চট্টগ্রামের ‘মেজবানি’ সংস্কৃতির যে বিশালতা আর আতিথেয়তা, তার বর্ণনা কলকাতার অনেক ভোজনবিলাসী লেখকের রচনায় পাওয়া যায় অত্যন্ত পরম মমতায়।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর মতো কালজয়ী উপন্যাসেও পূর্ববঙ্গের যে প্রাণের স্পন্দন পাওয়া যায়, তার রেশ অনেক ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের নদী-কেন্দ্রিক জীবনযাত্রার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
আধুনিককালের বহু কলকাতার কথাসাহিত্যিক আজও তাঁদের উপন্যাসের চরিত্রের মুখে চাটগাঁইয়া সংলাপ বসিয়ে সেই মাটির সোঁদা গন্ধ পাঠকদের নাকে পৌঁছে দেন। এই আদান-প্রদান প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক কাঁটাতার ভাষার টানে কখনো বাধা হতে পারে না। গঙ্গার তীরের সাহিত্যিক যখন কর্ণফুলীর পাড়ের মানুষের গল্প লেখেন, তখন সেখানে কেবল শব্দ নয়, জন্ম নেয় এক অবিচ্ছেদ্য আত্মার বন্ধন।
আরও নানা বিষয় জানতে ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com