আজহার মুনিম শাফিন, লন্ডন: লন্ডনের টেমস নদীর তীর ধরে হাঁটলে কিংবা পূর্ব লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে কান পাতলে মাঝেমধ্যেই চাটগাঁইয়া ভাষার চেনা সুর কানে আসে। জীবিকার তাগিদে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে ব্রিটেনে থিতু হওয়া চট্টগ্রামের মানুষের সংখ্যা আজ আর হাতেগোনা নয়।
কয়েক দশক ধরে তারা যেমন ব্রিটেনের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন, তেমনি পরম মমতায় আগলে রেখেছেন চট্টগ্রামের হাজার বছরের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে। সুদূর প্রবাসে নিজের শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াই ও উদ্যোগ এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
যুক্তরাজ্যে চট্টগ্রামের মানুষের পদচারণা শুরু হয়েছিল মূলত ব্রিটিশ আমলের সেই ‘লস্কর’ বা জাহাজি শ্রমিকদের হাত ধরে। বর্তমানে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস, বার্মিংহাম এবং ওল্ডহ্যামের মতো শহরগুলোতে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের মানুষেরা দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন। তবে নাগরিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও তারা ভুলে যাননি পাহাড়-সাগর ঘেরা চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের ঘ্রাণ। এই সংযোগ বজায় রাখার প্রধান কারিগর হিসেবে কাজ করছে লন্ডনের বিভিন্ন ‘চট্টগ্রাম সমিতি’ ও আঞ্চলিক সংগঠনগুলো।
এই সংগঠনগুলোর কার্যক্রম শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নেই। লন্ডনের কনফারেন্স হলগুলোতে মাঝেমধ্যেই আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী মেজবানের। কাঠের আগুনের ধোঁয়া আর সেই বিশেষ মসলার সুবাসে প্রবাসের যান্ত্রিক জীবন মুহূর্তেই পাল্টে যায় চট্টগ্রামের কোনো গ্রামের আমেজে।
সাদা ভাত আর নলা-গোশতের গন্ধে একাকার হয়ে যান কয়েক প্রজন্ম। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এটিই অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।
সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রেও চট্টগ্রামের মানুষেরা বেশ অগ্রগামী। আঞ্চলিক গান, পুঁথিপাঠ এবং চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে নিয়মিত আলোচনা সভা ও সেমিনার আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মাধুর্য ধরে রাখতে তারা সদা সচেষ্ট।
লন্ডনের বুক চিরে যখন চট্টগ্রামের ভাষায় নাটক বা গান পরিবেশিত হয়, তখন তা কেবল বিনোদনের মাধ্যম থাকে না, বরং এক টুকরো চট্টগ্রাম হয়ে ধরা দেয় প্রবাসীদের হৃদয়ে। এছাড়া আপদকালীন সময়ে দেশে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং ব্রিটিশ-বাংলাদেশি প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে এসব সমিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।