আমিরুল মোমেনিন, ঢাকা: রাজধানীর যান্ত্রিক জীবনে এক টুকরো নির্মল শ্বাস নেওয়া যেখানে দায়, সেখানে এখন ঘরের ছাদেই দুলছে লাউ, শিম আর টমেটো। বিষমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্যের সন্ধানে ঢাকার শত শত পরিবার এখন ‘অর্গানিক ফার্মিং’ বা ছাদবাগানের দিকে ঝুঁকছেন। শৌখিনতা পেরিয়ে এটি এখন অনেকের পারিবারিক পুষ্টির প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। কংক্রিটের এই ধূসর নগরীতে এক নীরব সবুজ বিপ্লব ঘটাচ্ছেন রাজধানীর বাসিন্দারা।
নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা
বাজারে পাওয়া অধিকাংশ শাকসবজিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিয়ে জনমনে রয়েছে তীব্র আতঙ্ক। এই উদ্বেগ থেকেই ছাদবাগানের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর ও উত্তরায় দেখা গেছে, অনেক বাড়ির ছাদ এখন ছোটখাটো খামারে পরিণত হয়েছে। কোনো রাসায়নিক ছাড়াই কেবল রান্নাঘরের বর্জ্য থেকে তৈরি জৈব সার ব্যবহার করে এসব বাগানে ফলানো হচ্ছে বেগুন, করলা, মরিচ ও হরেক রকমের শাক।
সফল পরিবারগুলোর গল্প
উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা শামীমা নাসরিন গত দুই বছর ধরে নিজের এক হাজার বর্গফুটের ছাদে বাগান করছেন। তিনি জানান, “গত তিন মাস ধরে আমার বাজার থেকে কোনো সবজি কিনতে হয়নি। নিজের হাতের লাগানো টাটকা শাকসবজি খাওয়ার তৃপ্তিই আলাদা। সবচেয়ে বড় কথা, আমি জানি আমি ও আমার সন্তানরা কী খাচ্ছি—তাতে কোনো বিষ নেই।”
কেবল গৃহিণী নন, অনেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমনকি তরুণ পেশাজীবীরাও অফিস সামলে সময় দিচ্ছেন ছাদবাগানে। মিরপুরের এক ব্যাংকার জানান, ছাদবাগান এখন তার মানসিক প্রশান্তির বড় জায়গা। সারাদিনের কাজের চাপ শেষে সবুজের মাঝে সময় কাটানো তাকে সতেজ রাখে।
পরিবেশ ও তাপমাত্রার ওপর ইতিবাচক প্রভাব
পরিবেশবিদদের মতে, একটি ভবনের ছাদে বাগান থাকলে তা ঘরের তাপমাত্রা ৪-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বাতাসের কার্বন ডাই অক্সাইড শোষিত হয় এবং অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়ে, যা দূষিত ঢাকার বাতাসের মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
প্রযুক্তি ও কৃষি বিভাগের সহায়তা
ছাদবাগান জনপ্রিয় করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এখন আধুনিক প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছে। এছাড়া ড্রিপ ইরিগেশন (ফোঁটা ফোঁটা সেচ) এবং হাইড্রোপনিক পদ্ধতির মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব অল্প পরিশ্রমেই সারা বছর সবজি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ‘গার্ডেনিং গ্রুপ’ তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষ একে অপরের সাথে অভিজ্ঞতা ও বীজ বিনিময় করতে পারছেন।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা বা ছাদ সুরক্ষার অভাবে অনেক সময় সমস্যার সৃষ্টি হলেও আধুনিক পদ্ধতিতে তা সহজেই সমাধান করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার অন্তত ৬০ শতাংশ ছাদ যদি পরিকল্পিতভাবে বাগানের আওতায় আনা যায়, তবে রাজধানীর সবজির চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ এখান থেকেই মেটানো সম্ভব।
বিষমুক্ত খাবারের এই আন্দোলন এখন ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। আপনিও কি আপনার ছাদকে সাজিয়েছেন সবুজে?