মোস্তফা তারেক, নিউ ইয়র্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমগুলোর বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তথ্যের আদান-প্রদান এখন আর কেবল দীর্ঘ কলাম বা দীর্ঘায়িত টেলিভিশন বুলেটিনে সীমাবদ্ধ নেই। ডেলয়েটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শর্ট-ফর্ম ভিডিও বা ‘রিলস’ এখন বিশ্ব সংবাদ শিল্পের নতুন ‘কালচারাল কারেন্সি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
আধুনিক পাঠকদের দ্রুত তথ্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ডিজিটাল অভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে সংবাদমাধ্যমগুলো এখন তাদের প্রধান সংবাদগুলোর পাশাপাশি শর্ট-ফর্ম ভিডিওকে একটি ‘উদ্ভাবনী ল্যাব’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
সংবাদিকতায় নতুন যুগের সূচনা: শর্ট-ফর্ম ভিডিওর প্রভাব
বর্তমান সময়ে মার্কিন সংবাদ শিল্পে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিনোদনের এক অনন্য মিশেল তৈরি হয়েছে। ডেলয়েট তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে যে, তরুণ প্রজন্ম তো বটেই, এমনকি বয়স্ক পাঠকরাও এখন জটিল সংবাদগুলো ৬০ সেকেন্ড বা তার কম সময়ের ভিডিওতে দেখতে পছন্দ করছেন। এটি কেবল প্রচারের মাধ্যম নয়, বরং নতুন ধরনের গল্প বলার শৈলী বা ‘স্টোরিটেলিং’-এর একটি পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে।
উদ্ভাবনী ল্যাব হিসেবে ছোট ভিডিওর ব্যবহার
নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং ওয়াশিংটন পোস্টের মতো বড় মিডিয়া হাউসগুলো তাদের নিউজরুমে আলাদা ‘শর্ট-ফর্ম ভিডিও ডেস্ক’ স্থাপন করেছে। তারা এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিম্নলিখিত উপায়ে ব্যবহার করছে:
১. জটিল বিষয়ের সহজ ব্যাখ্যা: কোনো জটিল অর্থনৈতিক নীতি বা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে সহজ গ্রাফিক্স এবং উপস্থাপনার মাধ্যমে এক মিনিটের মধ্যে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ২. সংবাদ পরিবেশনায় বৈচিত্র্য: গতানুগতিক সংবাদ পাঠের বদলে এখন অন-ফিল্ড সাংবাদিকরা সরাসরি স্মার্টফোন ব্যবহার করে খবরের পেছনের গল্প তুলে ধরছেন, যা পাঠকদের কাছে অনেক বেশি জীবন্ত ও নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে। ৩. ব্যবহারকারীর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি: ডেলয়েট-এর মতে, একটি বড় আর্টিকেলের তুলনায় একটি শর্ট ভিডিওর শেয়ারিং রেট প্রায় ৩৫০% বেশি। সংবাদমাধ্যমগুলো এই সুযোগটি ব্যবহার করে তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়াচ্ছে।
কালচারাল কারেন্সি হিসেবে এর গুরুত্ব
শর্ট-ফর্ম ভিডিও এখন কেবল একটি ফরম্যাট নয়, এটি সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক প্রচারণা থেকে শুরু করে সামাজিক আন্দোলন—সবকিছুরই মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন ছোট ছোট ক্লিপ। সাংবাদিকরা এখন সংবাদকে এমনভাবে তৈরি করছেন যেন তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার খোরাক জোগায়। এই ‘কালচারাল কারেন্সি’র ফলে সংবাদ মাধ্যমগুলো সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠছে।
প্রযুক্তির ভূমিকা ও ভবিষ্যত
২০২৬ সালের এই সময়ে এআই-এর ব্যবহার এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। একটি বড় সংবাদ প্রতিবেদন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছোট ভিডিও ক্লিপ তৈরি এবং তাতে সাবটাইটেল বা ভিজ্যুয়াল এফেক্ট যোগ করা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে।
সংবাদমাধ্যমগুলো বড় বিনিয়োগের ঝুঁকি না নিয়ে এই ছোট ভিডিওগুলোর মাধ্যমে নতুন নতুন আইডিয়া পরীক্ষা করছে, যা সফল হলে পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে রূপ দেওয়া হচ্ছে।
শর্ট-ফর্ম ভিডিও এখন আর কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সংবাদ শিল্পের মেরুদণ্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ডেলয়েটের এই পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দিনগুলোতে যারা এই দ্রুতগামী ভিডিও সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিতে পারবে না, তারা ডিজিটাল সংবাদ দৌড়ে পিছিয়ে পড়বে।