শামসুল ইসলাম, ঢাকা: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধির সমান্তরালে বাড়ছে এর উপজাত বা বর্জ্যের পরিমাণ, যা স্থানীয়ভাবে ‘ঝুট’ নামে পরিচিত। এক সময় এই ঝুটকে কেবল ফেলনা বা জ্বালানি হিসেবে দেখা হলেও, ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি হয়ে উঠেছে ‘সাদা সোনা’।
পরিসংখ্যান বলছে, বছরে প্রায় ৬ লাখ টন টেক্সটাইল বর্জ্য উৎপাদন করছে বাংলাদেশ, যার সঠিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের মাধ্যমে বছরে ৮ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা) বাড়তি আয় করা সম্ভব।
বর্জ্য যখন মূল্যবান সম্পদ
পোশাক তৈরির সময় কাটিং রুম থেকে যে কাপড় বা সুতার অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়, তার গুণগত মান অত্যন্ত উন্নত। বিশেষ করে বাংলাদেশ যেহেতু মূলত তুলা বা কটন-ভিত্তিক পোশাক বেশি উৎপাদন করে, তাই এই বর্জ্য থেকে উচ্চমানের রিসাইকেল্ড ইয়ার্ন বা সুতা তৈরি করা সম্ভব। বর্তমানে বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো তাদের উৎপাদনে ২০-৩০ শতাংশ রিসাইকেল্ড ফাইবার ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা বাংলাদেশের এই বর্জ্যের চাহিদাকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে।
কেন আমরা সুযোগ হারাচ্ছি?
সম্ভাবনা বিশাল হলেও বাস্তব চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত টেক্সটাইল বর্জ্যের মাত্র ৫ থেকে ২৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে রিসাইকেল করা হচ্ছে। বাকি একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক পথে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে রপ্তানি হয়ে যায়। এই বর্জ্যগুলোই আবার উন্নত প্রযুক্তিতে রিসাইকেল হয়ে সুতা হিসেবে চড়া দামে বাংলাদেশে আমদানি করতে হয়। ফলে একদিকে যেমন আমরা কাঁচামাল সস্তায় বিক্রি করছি, অন্যদিকে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে একই জিনিসের প্রক্রিয়াজাত রূপ কিনে আনছি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ‘ভ্যালু চেইন’ যদি আমরা দেশেই সম্পন্ন করতে পারতাম, তবে তুলা আমদানির ওপর নির্ভরতা অন্তত ১৫ শতাংশ কমানো সম্ভব হতো।
অর্থনীতির নতুন দিগন্ত
বর্তমানে দেশে ১৭ থেকে ২০টি কারখানা রিসাইক্লিংয়ের পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করছে। যদি এই খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়, তবে এটি কেবল বৈদেশিক মুদ্রাই সাশ্রয় করবে না, বরং অন্তত ৬ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি করবে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলগুলোতে এই রিসাইক্লিং হাব স্থাপনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগটি দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে এখন কেবল পোশাক রপ্তানিই যথেষ্ট নয়, বরং সেই পোশাকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা কতটা আধুনিক, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামীর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এই ‘ফেলনা’ বর্জ্যকেই আমাদের প্রধান সম্পদে রূপান্তর করতে হবে।
আগামী পর্বে পড়ুন: “নীতিমালার মারপ্যাঁচ ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা”