বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা। সকাল নয়টা বাজলেই যেখানে শুরু হয় ফাইলের শব্দ আর করপোরেট দৌড়ঝাঁপ। সুউচ্চ ভবনগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে যখন ‘সাহেবরা’ লাঞ্চের অর্ডার দেন, তখন তাদের সামনে পরিপাটি করে সাজিয়ে দেওয়া হয় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত কিংবা বিরিয়ানি। কিন্তু যে পিয়ন বা নিম্নপদের কর্মীটি অত্যন্ত যত্নসহকারে সাহেবের টেবিল পর্যন্ত খাবারটি পৌঁছে দিচ্ছেন, তিনি নিজে দুপুরে কী খাচ্ছেন? কিংবা তার সাহেবের জন্য আসা খাবারটিই বা কোন নরককুণ্ড থেকে তৈরি হয়ে আসছে?
আগ্রাবাদ ঢেবার পাড় সংলগ্ন রেলওয়ে ও বন্দরের ভূমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা অস্থায়ী হোটেলগুলোর ভেতরের চিত্র দেখলে যে কেউ আঁতকে উঠবেন। এটি কোনো সাধারণ নোংরা নয়, বরং এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির কারখানা।
যেখানে ড্রেন আর রান্নাঘর মিলেমিশে একাকার
অনুসন্ধানে দেখা যায়, জাঁকজমকপূর্ণ অফিসগুলোর ঠিক পেছনেই লোহা ও টিনের ঝুপড়িতে চলছে এসব হোটেলের বিশাল কর্মকাণ্ড। সরেজমিনে দেখা যায়, কোন কোন হোটেলের পেছনের অংশটি এতটাই বীভৎস যে, সেখানে সুস্থ মানুষের পক্ষে দুই মিনিট দাঁড়িয়ে থাকাও দায়। ইটের দেয়ালগুলো শ্যাওলা ধরা ও স্যাঁতসেঁতে। ঠিক দেয়াল ঘেঁষেই বয়ে গেছে খোলা ড্রেন, যেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে সারাক্ষণ।
সবচেয়ে আঁতকে ওঠার মতো বিষয় হলো, যে পাত্রে কয়েকশ মানুষের জন্য ভাত রাখা হয়েছে, সেটি রাখা হয়েছে সরাসরি মেঝেতে—ঠিক ড্রেনের কিনারে। কোনো ঢাকনা নেই, নেই কোনো পরিচ্ছন্নতার বালাই। এর পাশেই বড় বড় ডেকচিতে রান্না হচ্ছে তরকারি। থালা-বাসন ধোয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রেন সংলগ্ন ট্যাপের পানি, যার চারপাশ কাদা আর ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
কর্মীর নিষ্ঠা বনাম হোটেলের নিষ্ঠুরতা
অফিসের পিওন বা পিয়নরা যখন হোটেল থেকে খাবার নিয়ে যান, তারা কেবল সাহেবের রুচির কথা মাথায় রাখেন। কিন্তু নিজের পকেটের কথা চিন্তা করে যখন তারা নিজেরাই খেতে বসেন, তখন তাদের সামনে হাজির করা হয় ড্রেনের পাশের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে তৈরি হওয়া খাবার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংক কর্মচারী জানান, “আমরা জানি এই খাবারগুলো নোংরা পরিবেশে তৈরি। কিন্তু পেটের দায়ে সস্তায় খাওয়ার জন্য আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। আগ্রাবাদের ডাল-ভাতের অধিকাংশ হোটেলই এই ঢেবার পাড়ের নোংরা জায়গায়।”
নীরব ঘাতক যখন খাবারের থালায়
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবেশে তৈরি খাবার খাওয়া মানে স্বেচ্ছায় শরীরে রোগ ডেকে আনা। নর্দমার এত কাছে এবং খোলা অবস্থায় খাবার রাখলে তাতে ই-কোলাই (E. coli) সহ বিভিন্ন মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস মিশে যায়। যা থেকে টাইফয়েড, জন্ডিস এবং দীর্ঘমেয়াদী পেটের রোগ হওয়া অনিবার্য।
আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার মতো জায়গায় যেখানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান, সেখানে খাবারের এমন মান নিয়ে কোনো প্রশাসনিক তদারকি না থাকা আবশ্যক। ক্যাব কিংবা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে এসব অবৈধ ও অস্বাস্থ্যকর হোটেলের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com










