Home আন্তর্জাতিক লন্ডনে মুখোমুখি চরমপন্থী ও ফিলিস্তিনপন্থীরা: ব্যাপক উত্তেজনার আশঙ্কা

লন্ডনে মুখোমুখি চরমপন্থী ও ফিলিস্তিনপন্থীরা: ব্যাপক উত্তেজনার আশঙ্কা

আজহার মুনিম শাফিন, লন্ডন: যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের রাজপথ আজ এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। একদিকে ফিলিস্তিনপন্থী ও বর্ণবাদবিরোধীদের বার্ষিক ‘নাকবা ডে’ (বিপর্যয় দিবস) উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল গণমিছিল, অন্যদিকে উগ্র ডানপন্থী ও অভিবাসনবিরোধী জোটের ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ সমাবেশ—এই দুই বিপরীতমুখী কর্মসূচির কারণে সেন্ট্রাল লন্ডনে এক চরম যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই দিনে আবার লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে চেলসি ও ম্যানচেস্টার সিটির মধ্যে এফএ কাপের ফাইনাল ম্যাচ থাকায় গোটা শহরজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
মেট্রোপলিটন পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে তাদের ‘সবচেয়ে বড় ও নজিরবিহীন’ নিরাপত্তা অভিযান হিসেবে অভিহিত করেছে।
রুট বদল ও বৈষম্যের অভিযোগ
প্রতি বছর ১৫ মে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড থেকে উচ্ছেদের দিনটিকে স্মরণ করে ১৬ মে শনিবার লন্ডনে বড় ধরনের বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। তবে এবার ফিলিস্তিন সংহতি প্রচারণাকারীদের (PSC) নির্ধারিত ঐতিহ্যবাহী রুটটি মেট পুলিশ বাতিল করে দিয়েছে। উগ্র ডানপন্থী নেতা টমি রবিনসন (আসল নাম স্টিফেন ইয়াক্সলি-লেনন) এর নেতৃত্বাধীন ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ সমাবেশকে সেন্ট্রাল লন্ডনের প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্রস্থল তথা পার্লামেন্ট স্কয়ার ও হোয়াইটহলে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফিলিস্তিনপন্থীরা অভিযোগ করেছেন যে, বর্ণবাদী ও ইসলামোফোবিক গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে পুলিশ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে তাদের রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে।
দুই পক্ষের অবস্থান ও রুট
নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ দুই পক্ষের জন্য পৃথক রুট নির্ধারণ করে দিয়েছে:
নাকবা ডে ও বর্ণবাদবিরোধী মার্চ: সাউথ কেনসিংটনের এক্সিবিশন রোড থেকে দুপুর ১২টায় এই বিক্ষোভ মিছিল শুরু হবে। এরপর ক্রোমওয়েল গার্ডেন, নাইটসব্রিজ, পিকাডিলি হয়ে মিছিলটি সেন্ট্রাল লন্ডনের প্যাল ম্যালে গিয়ে শেষ হবে। এতে ‘স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজম’ এবং বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের ব্যানারে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের সমাগম হতে পারে।
ইউনাইট দ্য কিংডম সমাবেশ: উগ্র ডানপন্থীদের এই সমাবেশটি কিংসওয়ে থেকে শুরু হয়ে পার্লামেন্ট স্কয়ারে গিয়ে শেষ হবে। মেট পুলিশের অনুমান, এই সমাবেশে প্রায় ৫০ হাজার কট্টর ডানপন্থী সমর্থক অংশ নিতে পারে।
নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়
দুই পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য সহিংসতা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়াতে লন্ডনের রাস্তায় নামানো হয়েছে ৪,০০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য। অন্যান্য কাউন্টি থেকেও অতিরিক্ত পুলিশ আনা হয়েছে।
ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার জেমস হারম্যান জানিয়েছেন, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না এবং পুলিশ আইনের কঠোরতম প্রয়োগ করবে। এবারের অভিযানে লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন (LFR) প্রযুক্তি, ড্রোন, হেলিকপ্টার, ডগ স্কোয়াড এবং সাঁজোয়া যান (Armoured Vehicles) ব্যবহার করা হচ্ছে। এই সামগ্রিক নিরাপত্তা অভিযানের পেছনে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন পাউন্ড।
মুসলিম ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি সতর্কতা
মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন (MCB) এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সেন্ট্রাল লন্ডনে যাতায়াতকারী এশীয় ও মুসলিমদের, বিশেষ করে হিজাবধারী নারীদের অত্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে উগ্র ডানপন্থীদের সর্বশেষ সমাবেশে ব্যাপক ইসলামোফোবিক স্লোগান এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যাতে ২৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। এবারও যেকোনো ধরনের উসকানি বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সবাইকে দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করতে এবং হোয়াইটহল ও উইন্ডসর এলাকার আশপাশ এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
টানা কয়েকদিন আগের স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভরাডুবি এবং দেশের বর্তমান উচ্চ সতর্কতামূলক সন্ত্রাসবাদ হুমকির (Terrorism Threat Level) আবহে আজকের এই দ্বিমুখী গণবিক্ষোভ যুক্তরাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।

ভিজিট করুন www.businesstoday24.com