আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাব এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে বিশ্ব চা শিল্পে। তীব্র খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে চা বাগানগুলোতে পাতা পুড়ে যাওয়া (Scorch) এবং ‘ডাই-ব্যাক’ (Die-back) রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এর ফলে হেক্টর প্রতি চায়ের গড় উৎপাদনশীলতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যা উদ্বিগ্ন করে তুলেছে বাগান মালিক, অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক চা গবেষকদের।
এই চরম সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে চা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এখন বৈশ্বিকভাবে প্রথাগত চাষাবাদ পদ্ধতি বদলে খরা-সহনশীল ও উচ্চফলনশীল ক্লোন জাতের চা গাছ রোপণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে।
তীব্র খরা ও ডাই-ব্যাকের থাবা
চা চাষের জন্য সাধারণত মৃদু তাপমাত্রা এবং নিয়মিত সুষম বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়াসহ আফ্রিকার প্রধান চা উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও রেকর্ড পরিমাণ তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে। অতিরিক্ত তাপে চা গাছের কচি পাতা ও কুঁড়ি তামাটে রঙ ধারণ করে পুড়ে যাচ্ছে, যা চায়ের গুণগত মান নষ্ট করছে।
একই সঙ্গে বাগানে জেঁকে বসেছে ‘ডাই-ব্যাক’ রোগ। এই ছত্রাকজনিত রোগের কারণে চা গাছের ডালপালা ওপর থেকে শুকাতে শুকাতে নিচের দিকে মরে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তীব্র খরার কারণে গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এই ছত্রাক দ্রুত পুরো গাছকে গ্রাস করছে। হেক্টর প্রতি উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে বিশ্ববাজারে ব্ল্যাক টি এবং গ্রিন টির সামগ্রিক সরবরাহে টান পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ক্লোন জাতের চা গাছই এখন প্রধান ভরসা
ঐতিহ্যবাহী বীজ থেকে উৎপাদিত চা গাছগুলো চরম আবহাওয়া বা দীর্ঘ খরা সহ্য করতে পারে না। এই সংকট থেকে বাঁচতে কৃষি বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে বিশেষ গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবন করেছেন উচ্চফলনশীল ও খরা-সহনশীল ‘ক্লোন জাত’।
এই ক্লোন গাছগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য হলো:
গভীর মূলতন্ত্র: এগুলো মাটির অনেক গভীর থেকে পানি ও পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করতে পারে, যার ফলে দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলেও গাছ শুকিয়ে মরে না।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ডাই-ব্যাক বা রেড স্পাইডারের মতো মারাত্মক রোগ ও পোকার আক্রমণ প্রতিরোধী করে এগুলোকে তৈরি করা হয়েছে।
অধিক ফলন: প্রথাগত গাছের তুলনায় এই ক্লোন জাতের গাছ থেকে অনেক কম সময়ে এবং দ্বিগুণ পরিমাণে পাতা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
ভারত, কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের মতো শীর্ষস্থানীয় চা উৎপাদনকারী দেশগুলো এখন তাদের পুরনো ও অনুৎপাদনশীল চা গাছ উপড়ে ফেলে নতুন করে এই আধুনিক ক্লোন জাতের চারা রোপণের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক টি কমিটিও (ITC) বাগানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে এই রূপান্তরকে বাধ্যতামূলক করার তাগিদ দিচ্ছে।
টেকসই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধাক্কা কেবল উৎপাদনই কমায়নি, বরং সার, সেচ এবং রোগ দমনে বাগানগুলোর উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে গুণগত মান বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই। চা খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে যদি শতভাগ বাগানকে খরা-সহনশীল ক্লোন প্রযুক্তির আওতায় আনা না যায়, তবে আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক চায়ের বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।