কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশ রেলওয়ের হালনাগাদকৃত মহাপরিকল্পনা (Railway Master Plan) অনুযায়ী, দেশের পর্যটন ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় বান্দরবান জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূলত করিডোর-১ (ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার) এর অংশ হিসেবে এই সংযোগটি স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের মূল তথ্য:
মহাপরিকল্পনার নথি অনুযায়ী, ‘দোহাজারী থেকে বান্দরবান পর্যন্ত নতুন ব্রডগেজ (BG) সিঙ্গেল লাইন নির্মাণ’ প্রকল্পটি চতুর্থ পর্যায়ে (২০৩১-২০৩৫) বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত। ২০১৭ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী এই প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩,১৪৮ কোটি টাকা। এতে অর্থায়নের উৎস হিসেবে সরকারি তহবিল (GOB) এবং বৈদেশিক সহায়তার কথা উল্লেখ রয়েছে।
উপযোগিতা বিশ্লেষণ:
১. পর্যটন খাতের বিপ্লব: বান্দরবান দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। রেল সংযোগ স্থাপিত হলে যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ ও নিরাপদ হবে, যা পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে।
২. কৃষিপণ্য বিপণন: পাহাড়ী অঞ্চলে উৎপাদিত ফল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য দ্রুত এবং কম খরচে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে, যা স্থানীয় চাষিদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
৩. জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন: রেল সংযোগের ফলে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে যাতায়াত ব্যবস্থা আরও গতিশীল হবে।
পাহাড়ী এলাকায় রেললাইন নির্মাণ ব্যয়বহুল ও কারিগরিভাবে জটিল হলেও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সুফলের বিচারে এটি অত্যন্ত যৌক্তিক। এটি সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাবে এবং একটি পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। যথাযথ পরিবেশগত সমীক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পাহাড়ের ভারসাম্য বজায় রেখেই এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা জানান, পাহাড়ি এলাকায় রেলপথ নির্মাণ সমতলের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং জটিল। পাহাড়ি এলাকায় প্রতি কিলোমিটার (১০০০ মিটার) ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণে বর্তমানে গড়ে ১০০ কোটি থেকে ১৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। সেই হিসেবে প্রতি মিটারে খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা।
তবে এই ব্যয় কয়েকটি বিশেষ বিষয়ের ওপর নির্ভর করে কম-বেশি হয়:
টানেল ও ব্রিজ: যদি পথে দীর্ঘ টানেল (সুড়ঙ্গ) বা সুউচ্চ ভায়াডাক্ট (সেতু) নির্মাণ করতে হয়, তবে খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সুড়ঙ্গপথের ক্ষেত্রে প্রতি মিটারের খরচ কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
মাটির স্থায়িত্ব ও ঢাল: পাহাড়ের মাটির গঠন এবং ঢাল (Gradient) ঠিক রাখার জন্য যদি অতিরিক্ত প্রোটেকশন ওয়াল বা পাথর কাটার প্রয়োজন হয়, তবে ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
ভূমি অধিগ্রহণ: দুর্গম এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ এবং বনভূমি রক্ষা সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণের ব্যয়ও মোট খরচে প্রভাব ফেলে।
উল্লেখ্য যে, বান্দরবান প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ৩,১৪৮ কোটি টাকা ২০১৭ সালের প্রাক্কলন। বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি এবং নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণে বাস্তবায়নের সময় এই প্রতি মিটারের খরচ আরও বাড়বে।