Home First Lead কাঁচামাল ২৪ ঘণ্টায়: চীনের করিডোর প্রস্তাব কি বাংলাদেশের গেম-চেঞ্জার?

কাঁচামাল ২৪ ঘণ্টায়: চীনের করিডোর প্রস্তাব কি বাংলাদেশের গেম-চেঞ্জার?

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত ঐতিহাসিক চীন সফর দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত ভূ-অর্থনৈতিক অর্জন হলো ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’ (BMCEC) গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে আসা এই ত্রিমুখী করিডোর প্রস্তাবটি দেশের সামগ্রিক শিল্পায়ন, লজিস্টিকস অবকাঠামো এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আমূল পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই করিডোরের সম্ভাবনা নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ যদি এই অর্থনৈতিক করিডোরে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারে, তবে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সড়কপথে (ট্রাকে) চীন থেকে শিল্পকারখানার কাঁচামাল বাংলাদেশে নিয়ে আসা এবং দেশীয় উৎপাদিত পণ্য চীনে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
করিডোরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও লজিস্টিকস বিপ্লব
বর্তমানে চীন থেকে সমুদ্রপথে জাহাজে করে কাঁচামাল বাংলাদেশে আসতে বা পণ্য পৌঁছাতে গড়ে ১৫ থেকে ২৫ দিন সময় লাগে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরও দীর্ঘায়িত হয়, যা উৎপাদন খরচ ও  লিড টাইম  বাড়িয়ে দেয়। প্রস্তাবিত করিডোরটি মিয়ানমার হয়ে সরাসরি চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের মাল্টিমোডাল সংযোগ স্থাপন করবে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর প্রধান সুবিধাগুলো হলো:
বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি (বিসিসিসিআই)-র সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম মনে করেন, লজিস্টিকস খাতের এই যুগান্তকারী উন্নয়নের ফলে পণ্য পরিবহনের সময় কয়েক সপ্তাহ থেকে কমে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় নেমে আসবে। এতে ব্যবসায়ীদের চলতি মূলধনের ওপর চাপ কমবে। তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেন,  দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাতসহ অন্যান্য উদীয়মান শিল্প সম্পূর্ণভাবে আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। দ্রুত কাঁচামাল প্রাপ্তি নিশ্চিত হলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। চট্টগ্রামে আনোয়ারায় প্রস্তাবিত ৮০০ একরের চীনা শিল্প পার্কের শতভাগ সাফল্য নির্ভর করছে সাশ্রয়ী ও দ্রুত লজিস্টিকস ব্যবস্থার ওপর। করিডোরটি চালু হলে এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জোয়ার আসবে বলে মনে করেন খোরশেদ আলম।
বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস ও কৌশলগত বিনিয়োগ
চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে সব পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা প্রদান করেছে। তবে লজিস্টিকস জটিলতার কারণে এই সুবিধার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছিল না। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, করিডোরটি চালু হলে চীনের মূল বাজার আমাদের আরও কাছে চলে আসবে। এর ফলে একদিকে যেমন চীনে সরাসরি বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বাড়বে, অন্যদিকে তেমনি বিপুল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য সরাসরি চীনের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় প্রবেশ করলে দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব।
চ্যালেঞ্জ যেখানে
অর্থনৈতিকভাবে এই প্রস্তাবটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও এর বাস্তবায়নে কিছু ভূ-রাজনৈতিক ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন তথ্যাভিজ্ঞমহল। প্রথমত, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই করিডোর নির্মাণের প্রধান প্রতিবন্ধকতা। দ্বিতীয়ত, এই দীর্ঘ রুটে নিরবচ্ছিন্ন মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা একটি বড় প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক পরীক্ষা। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবটি বর্তমানে যৌথ সম্ভাব্যতা যাচাই ও গভীর পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে।
 প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চায়না ইকোনমিক করিডোর (যা পূর্বে বিসিআইএম বা বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের রুট হিসেবে পরিচিত ছিল) মূলত একটি মাল্টিমোডাল বা বহুমাত্রিক পরিবহন রুট। মূল লক্ষ্য হলো সড়ক, রেল ও বন্দর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের সংযোগ ঘটানো।
এর সম্ভাব্য এবং প্রস্তাবিত মূল রুটটি চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে করিডোরটি মিয়ানমারের বিভিন্ন অংশ (যেমন মান্দালয় ও রাখাইন রাজ্য) অতিক্রম করবে। এরপর এটি মিয়ানমার সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম (চট্টগ্ৰাম পোর্ট) এবং রাজধানী ঢাকার সাথে সরাসরি সংযুক্ত হবে।
যোগাযোগের মাধ্যম ও সুবিধা:
১. সড়ক ও রেল সংযোগের মাধ্যমে এই রুটে বাংলাদেশ থেকে অত্যন্ত দ্রুত সময়ে (প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে) চীনে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২. এই করিডোরের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর ও মংলা বন্দরকে আধুনিকায়ন করে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে মিয়ানমার এবং চীনের ইউনান অঞ্চল এই বন্দরগুলোর সুবিধা নিতে পারে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর কেবল একটি সড়ক বা রেল সংযোগ নয়, এটি বাংলাদেশের শিল্প খাতের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার। এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে তা দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক সংহতকরণে বাংলাদেশকে একটি অন্যতম আঞ্চলিক বাণিজ্য হাব  হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
নিয়মিত অর্থনৈতিক সংবাদ ও বিশ্লেষণ পেতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।