Home Third Lead ব্রিটেনের স্টুডেন্ট ভিসায় কড়াকড়ি

ব্রিটেনের স্টুডেন্ট ভিসায় কড়াকড়ি

নতুন গাইডলাইনে ৭০ পয়েন্ট নিশ্চিতের বাধ্যবাধকতা ও ডিপেন্ডেন্ট নীতিতে বড় ধাক্কা
লন্ডন: বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য যারা যুক্তরাজ্যে (ব্রিটেনে) আসার পরিকল্পনা করছেন কিংবা যারা বর্তমানে দেশটিতে পড়াশোনা করছেন, তাদের জন্য অত্যন্ত সতর্কবার্তা নিয়ে এসেছে হোম অফিসের নতুন গাইডলাইন। ২০২৬ সালের জুলাই মাসের আপডেট অনুযায়ী, স্টুডেন্ট ভিসার পুরো প্রক্রিয়াকে আরও বেশি কঠোর এবং পয়েন্ট-ভিত্তিক স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। নতুন নিয়মে মূল আবেদনকারীকে নিশ্চিতভাবে ৭০ পয়েন্ট অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে, স্পাউস (স্বামী/স্ত্রী) বা সন্তান তথা ডিপেন্ডেন্ট বা নির্ভরশীলদের ব্রিটেনে নিয়ে আসার পথ প্রায় সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে।
১. ৭০ পয়েন্ট-ভিত্তিক সিস্টেম: কীভাবে মিলবে এই পয়েন্ট?
যুক্তরাজ্যের ‘পয়েন্ট-ভিত্তিক ইমিগ্রেশন সিস্টেম’ (Points-Based System)-এর অধীনে একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে ভিসা পাওয়ার জন্য মোট ৭০ পয়েন্ট পূরণ করতে হবে। কোনো একটি শর্তে পয়েন্ট কম হলে ভিসা সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে। এই ৭০ পয়েন্টকে যেভাবে ভাগ করা হয়েছে:
কোর্স অফার (৫০ পয়েন্ট): হোম অফিস অনুমোদিত কোনো ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া বৈধ ‘কনফার্মেশন অব অ্যাকসেপ্টেন্স ফর স্টাডিজ’ (CAS) লেটার থাকতে হবে।
আর্থিক সক্ষমতা বা ফাইন্যান্সিয়াল প্রুফ (১০ পয়েন্ট): কোর্স ফি এবং যুক্তরাজ্যে জীবনযাত্রার খরচ বহনের পর্যাপ্ত আইনি অর্থ ব্যাংকে থাকার প্রমাণ দেখাতে হবে।
ইংরেজি ভাষার দক্ষতা (১০ পয়েন্ট): অনুমোদিত সেন্টার থেকে SELT (IELTS/PTE) বা সমমানের পরীক্ষায় নির্ধারিত স্কোর (যেমন- আন্ডারগ্রাজুয়েটের জন্য B1 এবং পোস্টগ্রাজুয়েটের জন্য B2 লেভেল) অর্জন করতে হবে।
২. ডিপেন্ডেন্ট (স্পাউস ও সন্তান) আনার নিয়মে বড় ধাক্কা
নতুন গাইডলাইনে সবচেয়ে বড় কড়াকড়ি করা হয়েছে পরিবার বা ডিপেন্ডেন্ট আনার ক্ষেত্রে। আগে অনেক সাধারণ মাস্টার্স (Taught Course) শিক্ষার্থীরাও স্পাউস নিয়ে আসতে পারতেন। তবে ২০২৬ সালের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী:
শুধুমাত্র পিএইচডি ও রিসার্চ-ভিত্তিক কোর্স: আপনি যদি কোনো ডক্টরেট (PhD) বা গবেষণা-ভিত্তিক উচ্চতর স্নাতকোত্তর (Research-based Postgraduate Degree) কোর্সে ভর্তি না হন, তবে কোনোভাবেই স্পাউস বা সন্তানকে ডিপেন্ডেন্ট হিসেবে আনতে পারবেন না।
সাধারণ মাস্টার্স ও ব্যাচেলরদের জন্য নিষেধাজ্ঞা: সাধারণ এমএসসি (MSc), এমএ (MA), এমবিএ (MBA) কিংবা এলএলএম (LLM)-এর মতো ‘টট মাস্টার্স’ (Taught Master’s) কোর্সের শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই পরিবার সাথে আনার যোগ্যতা পাবেন না।
৩. কঠোর আর্থিক প্রমাণ (Financial Proof)-এর নতুন শর্তাবলী
ভিসা নীতিতে জালিয়াতি ও ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্টের ব্যবহার বন্ধ করতে হোম অফিস ফাইন্যান্সিয়াল রিকোয়ারমেন্টস আরও কঠোর করেছে।
২৮ দিনের কঠিন নিয়ম (28-day Rule): টিউশন ফি বাদেও লন্ডনের ভেতরে পড়াশোনার জন্য প্রতি মাসে £১,৩৩৪ পাউন্ড এবং লন্ডনের বাইরে হলে প্রতি মাসে £১,০২৩ পাউন্ড হিসেবে ৯ মাসের সমপরিমাণ লিভিং কস্ট দেখাতে হবে। এই পুরো অর্থ আবেদনের ঠিক পূর্ববর্তী টানা ২৮ দিন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থাকতে হবে। একটু এদিক-ওদিক হলেই ভিসা বাতিল হবে।
ডিপেন্ডেন্টদের জন্য অতিরিক্ত ফান্ড: যাদের ডিপেন্ডেন্ট আনার বৈধ সুযোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রতি ডিপেন্ডেন্টের জন্য লন্ডনের ভেতরে প্রতি মাসে £৮৪৫ পাউন্ড এবং লন্ডনের বাইরে £৬৮০ পাউন্ড (সর্বোচ্চ ৯ মাসের জন্য) অতিরিক্ত দেখাতে হবে।
অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশন: হোম অফিস এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংকের মূল শাখার সাথে যোগাযোগ করে ফান্ডের সত্যতা যাচাই করছে। কোনো ধরনের ওভারড্রাফট, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা শেয়ার বাজারের ফান্ড এখানে গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. যারা অলরেডি ব্রিটেনে আছেন, তাদের করণীয়
যেসব বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে ব্রিটেনে অবস্থান করছেন, তাদের ক্ষেত্রেও এই গাইডলাইনের কিছু অংশ প্রযোজ্য হবে। বিশেষ করে যারা কোর্স পরিবর্তন করতে চান বা স্টুডেন্ট ভিসা থেকে অন্য ভিসায় (যেমন- ওয়ার্ক ভিসা) সুইচ করতে চান, তাদের পড়াশোনা শেষ করার আগে সুইচ করার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। তবে সুখবর এই যে, গ্র্যাজুয়েট রুট বা পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক (PSW) সুবিধাটি এখনো ২ বছরের জন্য বহাল রয়েছে, যা ডিগ্রি শেষ করার পর কাজের সুযোগ দেয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ব্রিটেনের ইমিগ্রেশন আইনজীবীরা বাংলাদেশ থেকে আসতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে বলেছেন, এজেন্সির ওপর অন্ধভাবে ভরসা না করে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট এবং ব্রিটিশ সরকারের অফিসিয়াল ডিরেক্টরি (GOV.UK) যাচাই করে আবেদন করতে। ব্যাংকের টাকা জমার তারিখ, সোর্সের স্বচ্ছতা এবং ইংরেজি পরীক্ষার সার্টিফিকেটের যথার্থতা শতভাগ নিশ্চিত করেই যেন ভিসার ফাইল জমা দেওয়া হয়।

* আজহার মুনিম শাফিন। লন্ডন।