শিপিং ডেস্ক:যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত জলসীমা, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর প্রণালীর আশেপাশে ইরানের তথাকথিত ‘ঘোস্ট ফ্লিট’ (Ghost Fleet) বা ছায়া বহরের নজিরবিহীন সক্রিয়তা দেখা গেছে। মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স ও ট্র্যাকিং সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে এই অঞ্চলে ইরানের তেলবাহী অন্তত ৩৮টি বিশালাকার ট্যাংকারের সন্দেহজনক উপস্থিতি ধরা পড়েছে। ছায়া বহরের এই গোপন ও অনিয়ন্ত্রিত তৎপরতা আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের সামগ্রিক ট্র্যাকিং এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান দীর্ঘদিন ধরে এই ছায়া বহর ব্যবহার করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সিঙ্গাপুর প্রণালী এবং মালয়েশিয়ার জলসীমার মধ্যবর্তী অঞ্চলে এদের গতিবিধি অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই জাহাজগুলো সাধারণত তাদের স্বয়ংক্রিয় আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (AIS) বা অবস্থান শনাক্তকারী ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে রাখে, যা শিপিংয়ের ভাষায় ‘ডার্ক অ্যাক্টিভিটি’ নামে পরিচিত। ফলে কৃত্রিম উপগ্রহ বা সাধারণ রাডারে এদের প্রকৃত অবস্থান কিংবা কোন দেশ থেকে তেল বহন করে নিয়ে যাচ্ছে, তা সহজে ট্র্যাক করা সম্ভব হয় না।
বিশ্লেষকরা জানান, এই ৩৮টি ট্যাংকার আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে (Ship-to-Ship বা STS) অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে তেল খালাস করছে। পরবর্তীতে এই অপরিশোধিত তেল অন্য কোনো দেশের বা বৈধ কোনো ডিলারের নামে আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে প্রবেশ করছে। এর মাধ্যমে ইরান একদিকে যেমন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কোটি কোটি ডলারের বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য সচল রাখছে, অন্যদিকে এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক তেলের মূল্যের সঠিক হিসাব রাখা এবং বাজার পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই ছায়া বহরের কারণে শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতাই তৈরি হচ্ছে না, বরং জলসীমার পরিবেশগত নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ এই বহরের অধিকাংশ জাহাজই বেশ পুরোনো এবং এদের আন্তর্জাতিক কোনো বিমা (Insurance) থাকে না। সিঙ্গাপুর প্রণালীর মতো অত্যন্ত ব্যস্ত একটি নৌ-রুটে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে চলাচলকারী এই পুরোনো ট্যাংকারগুলো যদি কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয় বা তেল নিঃসরণের (Oil Spill) মতো ঘটনা ঘটে, তবে তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO) এবং পশ্চিমা দেশগুলো এই ছায়া বহরের লাগাম টানতে নতুন কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয় কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিশ্ববাজারে ইরানের এই গোপন তেল সরবরাহ বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতি ও তেলের বাজারে কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে আপনি মনে করেন? আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্ট করে জানান। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির এমন সব চাঞ্চল্যকর খবর নিয়মিত পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com