Home Second Lead লালদিয়ায় এপিএম টার্মিনালসের গ্রাউন্ডব্রেকিং: বন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন মাইলফলক

লালদিয়ায় এপিএম টার্মিনালসের গ্রাউন্ডব্রেকিং: বন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন মাইলফলক

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: কর্ণফুলী নদীর তীরে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) আধুনিক গ্রিন বন্দর অবকাঠামো গড়ে তোলার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডেনমার্কের এপি মুলার-মারস্ক গ্রুপের ‘এপিএম টার্মিনালস’। রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে পতেঙ্গায় ‘এপিএম টার্মিনালস লালদিয়া’ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিস্থাপন ও নির্মাণকাজের উদ্বোধন (গ্রাউন্ডব্রেকিং সিরোমনি) অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় অংশীদার কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেডকে সঙ্গে নিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেলে পরিচালিত এই প্রকল্পকে দেশের সামগ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো রূপান্তরমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এপি মুলারের মতো আন্তর্জাতিক শীর্ষ লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে আগমন এক বিশাল মাইলফলক। সরকারের এক ট্রিলিয়ন ডলারের উচ্চাভিলাষী অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেসরকারি খাতের নেতৃত্ব ও বিশ্বমানের বন্দর অবকাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য। লালদিয়া টার্মিনাল শুধু নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক লজিস্টিকস হাব হিসেবে বাংলাদেশকে একটি উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যের কার্যকর প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। সরকার বিনিয়োগের সুরক্ষা ও ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে সর্বোচ্চ নীতিগত সহায়তা বজায় রাখবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে আজ নতুন এক অধ্যায় সূচিত হলো। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি এবং এই বাণিজ্যিক হাব সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বন্দর কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনায় লালদিয়া প্রকল্পের মতো পিপিপি মডেলগুলো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান জানান, বর্তমানে দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি এবং ৯৮ শতাংশের বেশি কনটেইনার পরিবহন চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। কর্ণফুলী নদীর পাড়ে ৫৯ দশমিক ১৫ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই লালদিয়া টার্মিনাল পরিবেশবান্ধব গ্রিন প্রযুক্তিতে সজ্জিত হবে। এর মধ্যে ৩২ একরে মূল টার্মিনাল, ৭ দশমিক ১৫ একরে কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একরে ট্রাক পার্কিং জোন নির্মিত হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে এটি বাণিজ্যিক অপারেশনে যুক্ত হবে। তিন বছরের নির্মাণকাল শেষে প্রকল্পটি প্রাথমিকভাবে ৩০ বছর এবং পরবর্তীতে আরও ১৫ বছর মেয়াদে পরিচালিত হবে।
প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে থাকছে ৭টি আধুনিক শিপ টু শোর (এসটিএস) গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন (ইআরটিজিএস) এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্র্যাক্টরস। এর ফলে টার্মিনালটিতে বছরে প্রায় ৯ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। ৬১৩ মিটারের জেটিতে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফট ও ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার বড় কনটেইনারবাহী জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে, যা সামগ্রিক টার্নঅ্যারাউন্ড সময় অনেকটাই কমিয়ে আনবে।
অর্থনৈতিক ও চুক্তিগত কাঠামোর দিক থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে এককালীন ২৫ মিলিয়ন ডলার প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি বছরে আড়াই লাখ ডলার কনসেশন ফি এবং প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে ২৩ ডলার রাজস্ব। প্রকল্পের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও টেকসই উন্নয়নের অংশ হিসেবে উচ্ছেদ হওয়া স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে এপিএম টার্মিনালস সরাসরি ১৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করার ঘোষণা দিয়েছে।
এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রমেশ ডেভিডের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এপিএম টার্মিনালস বিভি’র গ্লোবাল হেড অব বিজনেস ইমপ্লেমেন্টেশন জেক ক্রেইগ, বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার এবং নৌপরিবহন সচিব জাকারিয়া। অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল পুরোদমে চালু হলে তা বাংলাদেশের প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রমকে বিশ্বমানের সরবরাহ চেইনের সাথে সরাসরি সংযুক্ত করে জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পথ সুগম করবে।