চট্টগ্রাম: বিশ্বের শীর্ষ ১০০ কনটেইনার বন্দরের আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। বিগত এক দশকের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৯ সালে বন্দরটি আন্তর্জাতিক তালিকায় সর্বকালের সেরা ৫৮তম অবস্থানে উঠে এসেছিল। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অন্যান্য বন্দরের আগ্রাসী অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, দ্রুত আধুনিকায়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির বিপরীতে তাল মেলাতে না পেরে বন্দরটি পিছিয়ে পড়ে এবং বর্তমানে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ৬৮তম স্থানে স্থবির হয়ে রয়েছে।
শনিবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ও শিপিং প্রকাশনার সর্বশেষ বার্ষিক গবেষণা সংস্করণ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন, শুল্কনীতি পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের মধ্যেও শীর্ষ ১০০টি কনটেইনার বন্দরের সম্মিলিত থ্রুপুট দাঁড়িয়েছে ৭৯২ দশমিক ২ মিলিয়ন টিইইউস (TEUs), যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের বার্ষিক হিসাবে চট্টগ্রাম বন্দর ৪ দশমিক ১ শতাংশ হ্যান্ডলিং প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তবে আন্তর্জাতিক শীর্ষ ১০০ বন্দরের গড় প্রবৃদ্ধির গতি (৬.৩%) বেশি থাকায় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী বন্দরগুলোর দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে নিজস্ব হ্যান্ডলিং বাড়লেও বৈশ্বিক তালিকায় একধাপও এগোতে পারেনি বন্দরটি।
আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে দেখা যায়, বৈশ্বিক কনটেইনার বাণিজ্যে এশিয়া মহাদেশ তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করেছে। শীর্ষ ১০০ বন্দরের মোট হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৬৮ শতাংশই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এশিয়ার বন্দরগুলোর মাধ্যমে, যার মধ্যে এককভাবে চীনের বন্দরগুলো বৈশ্বিক মোট ট্রাফিকের ৪০ শতাংশের বেশি হ্যান্ডলিং করছে।
তালিকায় বরাবরের মতোই এক নম্বরে অবস্থান ধরে রেখেছে চীনের সাংহাই বন্দর, দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে চীনের নিংবো-ঝুশান বন্দর। অন্যদিকে লোহিত সাগর সংকট এবং প্রণালীগত অস্থিরতার কারণে ক্যারিয়ারগুলোর রুট পরিবর্তনের ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার ট্রান্সশিপমেন্ট হাবগুলো উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি প্রদর্শন করেছে।
কৌশলগত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বর্তমানে বন্দরগুলোর অবস্থান ও সাফল্য কেবল অভ্যন্তরীণ প্রথাগত বাণিজ্য বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করছে না; বরং ‘মেগাম্যাক্স’ আকৃতির বৃহৎ কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানোর ড্রাফট সক্ষমতা, জেটি অটোমেশন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নমনীয়তার ওপর নির্ভর করছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের মোট কনটেইনার বাণিজ্যের ৯৯ শতাংশ পরিচালিত হলেও ড্রাফট সীমাবদ্ধতা এবং টার্মিনাল লজিস্টিকস এখনও পুরোপুরি আধুনিক বৈশ্বিক মানে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার ও তালিকায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নিশ্চিত করতে গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়ন, আধুনিক টার্মিনালগুলোর সম্পূর্ণ অটোমেশন এবং দ্রুত টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে।