ঠগবাজির হাট
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: সন্ধ্যা নামলেই নগরীর অলিগলি, পাড়া-মহল্লা আর ব্যস্ত মোড়গুলোতে শুরু হয় একদল মৌসুমি মাছ বিক্রেতার চাতুর্যপূর্ণ হাঁকডাক। চকচকে রূপালি রঙের মাছ সাজিয়ে তারা পথচারীদের নজর কাড়ে কম দামে ইলিশ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে। কখনো ভ্যানে, কখনো মাথায় ডালিতে করে কিংবা কম আলোর গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করা হয়। কম দামে লোভনীয় সাইজের মাছ পেয়ে অনেক সাধারণ ক্রেতা বাড়ি নিয়ে কাটতে গিয়ে বুঝতে পারেন, আসল ইলিশ ভেবে তারা চড়া দামে কিনে এনেছেন ‘চন্দনা’, ‘চৌক্কা’ কিংবা ‘টাকিয়া’ জাতের কম দামি মাছ।
অসাধু চক্রটি সাধারণত দিনের কড়া আলো এড়িয়ে চলে। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত সময়ে নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চকবাজার, দেওয়ানহাট, ইপিজেড কিংবা আগ্রাবাদের কম আলো থাকা অলিগলিতে এদের তৎপরতা বাড়ে। দ্রুত মাছ বিক্রি করে সটকে পড়ার সুবিধার্থে এরা কম আলো ও ভাসমান অবস্থানকে বেছে নেয়। অনেকে ইলিশ বলে বিশ্বাস করাতে ছোট বরফের টুকরো দিয়ে মাছগুলো চকচকে করে রাখে এবং ক্রেতাকে যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে প্যাকেট করে দেয়।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইলিশের আদলে বিক্রি হওয়া এসব মাছ মূলত সামুদ্রিক ‘চন্দনা’ , ‘চৌক্কা’ কিংবা সার্ডিন প্রজাতির মাছ। বঙ্গোপসাগর থেকে স্থানীয় ফিশিং ট্রলারগুলো যখন মাছ ধরে কর্ণফুলী নদীর ফিশারি ঘাট বা চরপাথরঘাটা আড়তে নিয়ে আসে, তখন কম দামের এসব মাছ ট্রলার থেকে নামানো হয়। আড়তে এই মাছগুলোর পাইকারি দর ইলিশের তুলনায় অনেক কম। সেখান থেকেই চক্রটি সামান্য মূল্যে মাছ কিনে এনে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকে পুঁজি করে ইলিশের নামে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়।
আসল ইলিশ ও নকল মাছ চেনার সহজ উপায়
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আসল ইলিশের তুলনায় চন্দনা বা চৌক্কা মাছের শারীরিক গঠনে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ইলিশ মাছের পেট সাধারণত বাঁকানো ও পুরো শরীর মসৃণ নৌকার মতো গোলগাল থাকে। অন্যদিকে নকল বা চন্দনা মাছ তুলনামূলক চ্যাপ্টা, এদের চোখের রঙ ইলিশের তুলনায় বেশি বড় ও রক্তাভ দেখায় এবং পিঠের দিকের রঙ কিছুটা কালচে বা নীলাভ আভা দেয়।
এছাড়া ইলিশের গায়ে আঁশগুলো সুষমভাবে সাজানো ও চকচকে রুপালি থাকে, কিন্তু চন্দনা বা সার্ডিনের আঁশ হাত দিলে সহজেই ঝরে পড়ে এবং খসখসে লাগে। সবচাইতে বড় পার্থক্য হলো ইলিশের অনন্য সুবাস, যা চন্দনা বা চৌক্কা মাছে থাকে না; বরং এতে তীব্র সামুদ্রিক গন্ধ পাওয়া যায়।
ক্রেতারা কীভাবে প্রতারণা থেকে বাঁচবেন?
অস্বাভাবিক কম দামে কোনো বিক্রেতা মাছ দিতে চাইলে শুরুতেই সতর্ক হতে হবে। সন্ধ্যার আঁধারে বা গলির মুখে দাঁড়িয়ে যাচাই ছাড়া মাছ কেনা থেকে বিরত থাকা জরুরি। মাছ কেনার সময় পিঠের গঠন, চোখের স্বচ্ছতা এবং আঁশের স্থায়িত্ব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। নির্ধারিত ও পরিচিত বাজার ছাড়া ভাসমান বিক্রেতাদের কাছ থেকে ইলিশ কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক নজরদারি থাকলে এই অসাধু চক্রের ফাঁদ থেকে সহজে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।










